চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার নিয়ে হাহাকার, খুচরা বাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ
শীতকালীন ফসলের আবাদ ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সময়মতো সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘ অপেক্ষা, হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দামে সার না মিললেও খুচরা বাজারে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বন্ধন ট্রেডার্স নামের একটি সার বিক্রয়কেন্দ্রে কৃষকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
কৃষক, সার ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে- চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে সারের প্রয়োজন নিরূপণে দুর্বলতা, বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং কৃষকদের একাংশের আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা। কৃষিজমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সংকটের কারণ নিয়ে কৃষি বিভাগের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষক ও ডিলারদের অভিজ্ঞতার মিল নেই।
কৃষকেরা বলছেন, শীতকালীন সবজি, পেঁয়াজ, সরিষা ও ভুট্টার আবাদ সামনে রেখে এখন সার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ সময়ে একাধিক বিক্রয়কেন্দ্রে ঘুরেও চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ডিলারদের দাবি, নভেম্বর মাসে আলু, পেঁয়াজ ও শীতকালীন সবজির আবাদ শুরু হলে চাহিদা আরও বাড়বে। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কৃষকেরা প্রয়োজনের আগেই সার সংগ্রহ করায় বর্তমান চাপ তীব্র হয়েছে।
সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি—চার ধরনের সারের মোট চাহিদা ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ ১ লাখ ১ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন। ফলে মোট ঘাটতি ১৩ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টন।
সূত্র জানায়, সার সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ৩৮ জন এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ৫৮ জন ডিলার রয়েছেন। কৃষকদের মধ্যে ডিএপি সারের চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো, এক বস্তা ইউরিয়া ও এক বস্তা টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা করে। এই দুই ধরনের সারের পরিবর্তে ডিএপি সার প্রয়োগে সমপরিমাণ উপকার পাওয়া যায় বলে কৃষকেরা ডিএপি সারের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বিসিআইসির এক ডিলার বলেন, তাঁর ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন ডিএপি সার প্রয়োজন। অথচ অক্টোবর ও নভেম্বর- দুই মাস মিলিয়ে বরাদ্দ পেয়েছেন প্রায় ৬৫ মেট্রিক টন। এ পরিমাণ সার দিয়ে সব কৃষকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর শুধু নভেম্বর মাসেই তাঁর বরাদ্দ ছিল ৬০ মেট্রিক টন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) জেলা শাখার সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে সবার চাহিদা মেটানো কঠিন। প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। তিনি আরও বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় শতাধিক সহকারী কৃষি অফিসার রয়েছেন তারা সঠিকভাবে তালিকা ও সারের প্রয়োজনীতা নিশ্চিত করতে পারলে উদ্ভুত সমস্যা হতো না। এছাড়া কৃষকগণ অতিরিক্ত সার ক্রয় করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪৫টি ইউনিয়নে একই ধরনের ফসল উৎপাদিত হয় না। কোথাও আমসহ বিভিন্ন ফলের চাষ বেশি, কোথাও আবার মৌসুমি ফসলের আবাদ গুরুত্ব পায়। আম, পেয়ারা, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফল ও ফসলের আবাদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারের প্রয়োজনও পরিবর্তিত হচ্ছে। অথচ এলাকার ফসলের বিন্যাস ও চাষের পরিমাণের পার্থক্য যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে বরাদ্দ ও বণ্টনের হিসাব করা হলে কোথাও ঘাটতি, আবার কোথাও উদ্বৃত্ত তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।
কৃষক বাসার আলী বলেন, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। ফলে সরকারি দামে সার কেনার সুযোগ না পেয়ে কৃষকদের বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ডিলার পয়েন্টে সার না পাওয়ার পাশাপাশি খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাঁদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা দোকানে বাড়তি টাকা দিলে সার মিলছে।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বলেন, ‘উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। সিন্ডিকেটও নেই। চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, শুধু নভেম্বর মাসের জন্য উপজেলায় ১ হাজার ২৭৭ মেট্রিক টন ডিএপি, ৫০ মেট্রিক টন এমএপি, ২০৪ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সারের অনিয়ম বন্ধে চলমান অভিযানে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন , চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কৃষকেরা বর্তমান আবাদে ব্যবহারের পাশাপাশি পরবর্তী ফসলের জন্যও আগাম সার সংগ্রহ করছেন। সার পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কা থেকে তাঁদের মধ্যে তাড়াহুড়ো তৈরি হয়েছে, যা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলার কারণ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ডিলারদের দাবি অনুযায়ী পরিস্থিতিকে কোনো সিন্ডিকেটের কারসাজি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, ফসলভিত্তিক ও এলাকাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ, ডিলারদের বরাদ্দের স্বচ্ছ হিসাব এবং সরকারি দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল। তাঁদের মতে, এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো কঠিন হবে। আর আবাদ মৌসুমে সার পেতে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন ব্যয় ও কৃষকের ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনায়।