বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬

মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্মদিন আজ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন
মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্মদিন আজ

পাকিস্তানের মাটিতে সমাহিত করা হয়েছিল তাঁকে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দিতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই বীরের কবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। 


১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। কিন্তু বিমানটি বিধ্বস্ত হলে শহীদ হন তিনি। ৩৫ বছর পর তাঁর দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনা হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। তিনি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান—মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক।


জন্ম ও কর্মজীবন

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডের পৈতৃক বাড়ি ‘মোবারক লজে’ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মা সৈয়দা মোবারকুন্নেছা খাতুন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে।


১৯৬১ সালের ১৫ আগস্ট তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি বিমানবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন তিনি।


মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মতিউর রহমান ছুটিতে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা হয়েও তিনি স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। ভৈরবে বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় প্রতিরোধযুদ্ধেও অংশ নেন তিনি।


দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের করাচিতে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার পরও তাঁর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া। এ জন্য তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করেন।


বিমান নিয়ে পালানোর দুঃসাহসিক চেষ্টা

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট করাচির মশরুর বিমানঘাঁটি থেকে টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করেন মতিউর রহমান।


ওই বিমানের প্রশিক্ষণার্থী পাইলট ছিলেন রশিদ মিনহাজ। বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।


একপর্যায়ে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এতে মতিউর রহমান ও রশিদ মিনহাজ—দুজনই নিহত হন। ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার তাঁর স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।


তবে তাঁর এই প্রচেষ্টা ছিল স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখার এক দুঃসাহসিক দৃষ্টান্ত। শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটি থেকে বিমান নিয়ে বেরিয়ে আসার এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি নিজের অবিচল আনুগত্যের প্রমাণ দেন।


পাকিস্তান থেকে বাংলার মাটিতে

শহীদ হওয়ার পর পাকিস্তানের করাচিতে মতিউর রহমানকে সমাহিত করা হয়। দীর্ঘদিন পর ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ২৫ জুন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনরায় সমাহিত করা হয়।


যে দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই দেশের মাটিতেই শেষ পর্যন্ত চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি।


বীরত্বের স্বীকৃতি ও অমর উত্তরাধিকার

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ মতিউর রহমানকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন হিসেবে তাঁর নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।


আজ ২৯ অক্টোবর তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীর সন্তানকে।


বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেম শুধু কথায় নয়, প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়। স্বাধীনতার জন্য তাঁর সাহসী পদক্ষেপ, আত্মত্যাগ ও অবিচল সংকল্প নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।