বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬
পাবনায় জোড়া খুন

এখনও অধরা হত্যাকারীরা. হয়নি রহস্য উদঘাটন, নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তার ও হাটের দখল

শাহীন রহমান, পাবনা ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শাহীন রহমান, পাবনা ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০৭ অপরাহ্ন
এখনও অধরা হত্যাকারীরা. হয়নি রহস্য উদঘাটন, নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তার ও হাটের দখল
নিহত কার্যক্রম নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগ নেতা আব্দুস সালাম হাজী (টুপি পড়িহিত) ও শ্রমিকদল নেতা রিপন হোসেন। ছবি : সংগৃহীত।

ঘটনার দু’দিন পেরিয়ে গেলেও পাবনার পুষ্পপাড়া বাজারে জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এখনো অধরা হত্যাকারীরা। ঘটনার পর থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এলাকায়। কারা, ঠিক কি কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে বিষয়ে মুখ খুলছে না নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী। জানাযা ও লাশ দাফন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এখনও মামলা করেনি পরিবার। শুক্রবার দুপুরে নিহত দুইজনের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাদ আসর তাদের ধর্মগ্রামে জানাজা নামাজ ও দাফন সম্পন্ন হয়।


এদিকে, একই বাজারে ২০১৪ সালের ৩০ মে চারজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার এক যুগ পর ফের জোড়া খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত স্থানীয়রা। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরমপন্থিদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আর আধিপত্যের লড়াইয়ে ঝরছে প্রাণ। অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা।


শুক্রবার বিকেলে পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা থানার পুষ্পপাড়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নিরবতা চারিদিকে। দোকানপাট সব বন্ধ। নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বাজারের পাশে রয়েছে বিশাল পশুর হাট। এই হাট থেকে প্রতিবছর বিপুল টাকা আয় হয়। চলতি বছরে হাটটি ইজারা পান কার্যক্রম নিষিদ্ধ সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক আবদুস সালাম হাজী। তার সাথে অংশীদারিত্বে ছিলেন তার ভাগ্নে আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি রিপন হোসেন।


হত্যার বিভিন্ন কারণ নিয়ে গুঞ্জন

হত্যার কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে এখনও অন্ধকারে নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী। তবে স্থানীয় একাধিক সুত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগ নেতা আব্দুস সালাম হাজী বিগত সরকারের সময় এই হাট ইজারা নিয়ে পরিচালনা করেছেন দীর্ঘবছর। আওয়ামী সরকারের পতনের পরও সালাম হাজী হাটের ইজারা পেয়ে আসছিলেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি ইজারা পেয়েছেন। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে তার ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করে বিএনপির সাথে ঘনিষ্টতা বাড়িয়েছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। আবার শ্রমিকলীগ নেতা সালাম হাজীর চাচাতো ভাগ্নে রিপন আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি ছিলেন। এখানে বিএনপি-আওয়ামীলীগ মিশে যাওয়া, সেই কারণ আর হাট ইজারা না পাওয়ায় একটি পক্ষ তার উপর ক্ষুব্ধ থাকার কারণ উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্থানীয়রা।


চরমপন্থি প্রবণ এলাকা

আতাইকুলা থানা এলাকা চরমপন্থিত অধ্যুষিত। চরমপন্থিদের একটি প্রভাব রয়েছে এই এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে চরমপন্থি বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলে আসছে। তারাও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন। যেখানে কোনো কারণে সালাম হাজী ও রিপন তাদের বাধা হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো চাঁদাদাবির ঘটনা সম্পৃক্ত আছে কিনা সেটিও আলোচনা চলছে। এসব নানা সমীকরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে। তবে ঠিক কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড আর কারা জড়িত সে বিষয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। ফলে রহস্য ঘনিভূত হচ্ছে।


পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামারা তাসবিহা জানান, পুষ্পপাড়া হাটটি গত এপ্রিল মাসে ইজারা দেওয়া হয় এক বছরের জন্য। তবে প্রতি সপ্তাহে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে ইজারা দেওয়া হয়েছে। আব্দুস সালাম হাজী প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩ হাজার টাকার ডাকে ইজারা পেয়েছেন। উল্লেখ্য, সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার পুষ্পপাড়া হাট বসে। এর মধ্যে পশুর হাট বসে বৃহস্পতিবার।


প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নিহত সালাম হাজীর ছেলে রাহাত হোসাইন বলেন, বৃহস্পতিবার হাটের কাজ শেষে সন্ধ্যায় অফিস পক্ষে বসে নাস্তা করছিলেন আমার বাবা ও রিপন হোসেন। আমি পাশের দোকানে ছিলাম। সন্ধ্যা সাতটার দিকে মুখোশধারী ৭-৮ জন দুর্বৃত্ত হেঁটে এসে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। আমি দৌঁড়ে বাইরে আসার চেষ্টা করলে তারা আমার উপরও গুলি করে। আমি পাশের একটি ছোট টেবিল তাদের দিকে ছুঁড়ে মারলে তারা দ্রুত চলে যায়। আমি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাই। সবাই মিলে দ্রুত তাদের পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে বাঁচানো যায়নি তাদের।


আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনাস্থলের পাশের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা ছিল ৬ থেকে ৭ জন। সবারই মুখ কাপড়ে ঢাকা। এসেই দু’জনের উপর গুলি চালাল। এরপর যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন’।


কি বলছেন স্বজনরা

কারা, কি কারণে দুইজনকে হত্যা করেছে সে বিষয়ে এখনও অন্ধকারে সালাম হাজীর ছেলে রাহাত হোসাইন। বলেন, এলাকায় কারো সাথে অন্য কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ তো আমার জানা নেই। যেটুকু শুনতেছি বা বুঝতেছি পুষ্পপাড়া হাট ইজারা নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকতে পারে। যারা এসেছিল প্রত্যেকের মুখ বাধা ছিল। অন্ধকারে কাউকে চিনতে পারিনি।


নিহত আব্দুস সালামের ভাই আবুল কালাম বলেন, আমার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। ২০১৪ সালের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আমাদের পরিবারের সদস্যদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। ওই হত্যাকাণ্ডের সময় আমি জেলে ছিলাম, তারপরও আমার নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। এই এলাকায় অপরাধীরা আমাদের কারণে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ করতে পারে না। এ জন্যই তারা আমাদের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে।


নিহত রিপন হোসেনের বড় ভাই আতিক হোসেন বলেন, আমার ভাই শ্রমিকদলের ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন। এবার আসন্ন ইউপি নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থীও ছিলেন। কাউকে একটি চড়ও মারতে দেখিনি কখনও। কারো সাথে বিরোধে জড়ালে জানতাম। এখন কি কারণে কারা তাকে এভাবে মেরে ফেললো তা বুঝতে পারছি না কিছুই। তবে যারাই জড়িত থাক তাদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি চাই।


যা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা

বাজারের ব্যবসায়ী জাকের আলী, প্রতিবেশি আমিরুল ইসলাম ও স্থানীয় কৃষক দৌলত হোসেন বলেন, চরমপন্থী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় পুষ্পপাড়া হাটের দখল নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে ৩০ মে পুষ্পপাড়া বাজারে চারজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। যে মামলার রহস্য আজও উদঘাটন হয়নি। আসামিরা জামিনে থাকায় এখনো শাস্তির আওতায় আসেনি তারা। ফলে এক যুগ পর আবারও রক্তাক্ত হলো পুষ্পপাড়া বাজারের মাটি। এ নিয়ে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। সরকার যেন কঠোর হাতে অপরাধীদের দমনের পদক্ষেপ নেয়।


পাবনা সদর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব রেহানুল ইসলাম বুলাল বলেন, রিপন আমাদের দলের একজন ভাল কর্মী। শ্রমিক দলের নেতা ছিলেন। আমরা খুবই মর্মাহত ও শোকাহত। আমাদের দাবি, পুলিশ যেন দ্রুত অপরাধীদের সনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসে। না হলে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। মানুষের শান্তি কেড়ে নেবে। এটা হতে দেয়া যায় না।


পুলিশের তদন্ত কতদূর

আতাইকুলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রদীপ কুমার বিশ্বাস জানান, জোড়া খুনের ঘটনায় শনিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত মামলা হয়নি। নিহতদের স্বজনরা লাশের জানাযা ও দাফন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় হয়তো মামলা করেননি। আজ রাতের মধ্যে মামলা করার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।


পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ জানান, আমরা এখনও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারিনি। তবে হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। হত্যাকারীদের সনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আতাইকুলা চরমপন্থি প্রবণ এলাকা অনেক আগে থেকে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। তাদের দৌরাত্ম্য কমেছে। এই জোড়া খুনের পেছনে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


সিসিটিভির ফুটেজে যা দেখা গেছে

হত্যার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিট। পশ্চিম দিক থেকে এসে ছয়জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত সালাম হাজীর অফিসের সামনে গিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে দুই ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার পর আবার পশ্চিম দিক দিয়েই পালিয়ে যায় তারা। যাওয়ার সময় ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যায়, যাতে আশপাশের কেউ এগিয়ে আসতে সাহস না পায়।


২০১৪ সালে একইস্থানে ঘটেছিল ফোর মার্ডার

২০১৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় পাবনার সদর উপজেলার আতাইকুলা থানার পুষ্পপাড়া বাজারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে চারজন নিহত হয়েছিলেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন:


সুলতান (৩৫), মজনু (৩৮), সালাম (৪০) ও রফিকুল ইসলাম (২৫)। তারা ধর্মগ্রাম ও পীরগাছা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। নিহতরা তৎকালীন আওয়ামীলীগ কর্মী ছিলেন। পুষ্পপাড়া বাজারের একটি দোকানে বসে থাকা অবস্থায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করেছিল। ওই ঘটনায় আতাইকুলা থানায় ৩৯ জনের নাম উল্লেখসহ ৬৪ জনকে আসামি করে নিহত সুলতানের ভাই জহুরুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। জড়িত সন্দেহে ৮ জনকে আটক করেছিল পুলিশ। পরবর্তীতে জামিনে বের হন গ্রেপ্তারকৃতরা। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি।