এ সময়ের আলোঝলমলে সাহিত্য পর্ষদ অন্ধকারে

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা) :
এক সময়ের জমজমাট পাকশীর বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ এখন ভুতুড়ে স্থানে পরিণত হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের ঠিক সামনে ১৩ বছর আগে গড়ে ওঠে ‘পাক্শী বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ’ নামের ব্যতিক্রমী একটি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র। একই স্থানে গড়ে ওঠে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মঞ্চ।’
যেখানে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দিবস উৎযাপন, লাইব্রেরি থেকে বই পড়া, নিয়মিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও মঞ্চে নাটক, সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। প্রতি বছর মহান বিজয় দিবসে এই মুক্তমঞ্চে আয়োজন হতো শিশু-প্রবীণ ও মুক্তিযোদ্ধাভোজের।
এই সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদে স্থাপন করা ম্যুরালগুলি গত বছর দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরদিন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভেঙে ফেলার পর থেকে একসময়ের আলো ঝলমলে সাহিত্যাঙ্গন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ২০১২ সালে গড়ে তোলা হয় এই সাহিত্য পর্ষদ। যেখানে শোভা পেত শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা ভাষানী, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লি কবি জসিম উদ্দীন,
বেগম রোকেয়া, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কবি বন্দে আলী মিয়া, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, লালন সাঁইজী, শিল্পচার্য জয়নুল আবেদীন ছাড়াও যেখানে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের গণমিছিলের ম্যুরাল, ক্ষুদি রামের ফাঁসির মঞ্চ, সালাম বরকত, জব্বার, শফিউলসহ ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারী ভাষা শহীদ, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৭ জন বীর শ্রেষ্ঠদের মুখায়বব এর প্রতিচ্ছবি থেকে শুরু করে ফুটবলের রাজা পেলে, বিশ্ব সঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পি মাইকেল জ্যাকসন,
বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, বেতার, মোবাইল, বিদ্যুৎ এর আবিষ্কারকদের ম্যুরাল, পোড়া মাটির তৈরী বিশালাকৃতির জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পতাকা ও ব্যতিক্রমী উপায়ে তৈরী বাংলাদেশের বিশাল মানচিত্র খোদাই করার নান্দনিক দৃশ্য। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি এসব মনীষীদের মুখাকৃতি দেখতে প্রতিদিন এখানে ভিড় করতো ছোট-বড় সব বয়সী শত শত মানুষ।
সাহিত্যের অন্যরকম আবহ আর নানা প্রজাতির গাছ গাছালিতে সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক নৈসর্গে এসে কিছুক্ষণের জন্য সাহিত্যপ্রেমিরা যেমন এখানে এসে খুঁজে পেতেন মনের খোরাক, তেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও তাঁরা উপভোগ করতেন মনের আনন্দে। কিন্তু
এসব মনীষীদের পোড়ামাটির মুখায়বব ও ম্যুরালের নাক, চোখ, মুখ বিকৃত করে ভেঙে বিনষ্ট করার পাশাপাশি দেশের মানচিত্রসহ জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি বিশাল স্থাপনাগুলোও ভেঙে দেয়। স্থানীয়রা জানান, এর পর থেকে এই বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মঞ্চ কার্যত অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
আগে বছরের বিভিন্ন সময়ে ও প্রায় প্রতিদিনই যেখানে সাহিত্য চর্চা হতো সেখানে গত ১ বছর ৩ মাস ধরে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন চোখে পড়েনি এখানে। একসময়ের জমজমাট ‘পাকশী বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ’ ও ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মঞ্চ’ এখন পরিত্যাক্ত স্থানে পরিণত হয়েছে।
প্রবীন মুক্তিযোদ্ধা এমদাদুল হক আমান বলেন, আমরা যারা সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রেমিক মানুষ তারা এখানে এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি বুক ভরে ‘সাহিত্যের নিশ্বাস’ গ্রহনের সুযোগ পেতাম। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা সে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
‘পাকশী বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ’ ও ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মঞ্চ’ এর প্রতিষ্ঠাতা কবি বাচ্চু আলী আবেগঘন হয়ে বলেন, ঈশ্বরদী ও পাকশীর বহু মানুষের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের নিরবতা আমাকে প্রচন্ডভাবে কষ্ট দেয়।
ভেঙ্গে ফেলা মনীষীদের ম্যুরাল ও প্রকৃতির দিকে তাকালেই হুহু করে কান্না আসে। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এই সাহিত্য পর্ষদের ভেঙে ফেলা ম্যুরালগুলি সংস্কার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এ বছর মহান বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে এবার যেন অন্ধকার পরিবেশে আলো ফুটে ওঠে সে ব্যবস্থা করা হবে।