ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন: ঘরে-বাইরে সমান তালে জোর প্রচারণায় জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে। ডিসেম্বর মাসে ঘোষণা হওয়ার কথা নির্বাচনের তফসিল। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। সবার আগে ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের ইসলামীর প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। করছেন লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ। তবে অন্য দলের দলীয় কর্মসূচি বাদে নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে না।
জনমত তৈরি এবং ভোটের মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে চাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। নতুন কৌশলেও বেশ সক্রিয় দলটি। দলটি পিআরসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করছে। এছাড়াও মহানগর থেকে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন, পাড়া-মহল্লাকেন্দ্রিক বিক্ষোভ মিছিল, সভা করার মাধ্যমে গণসংযোগ করছেন দলটির নেতারা। এর মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন তারা। একই সঙ্গে ভোটের মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে যাচ্ছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। মোটের ওপর ঘরে-বাইরে সমান তালে শৃঙ্খলিত উপায়ে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। পিছিয়ে নেই দলটির নারী বিভাগের কর্মীরাও। কর্মিসম্মেলন, উঠান বৈঠকসহ নানান কার্যক্রমে ব্যস্ত তারাও।
নির্বাচন সামনে রেখে প্রচার-মাঠে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে জামায়াতের নারী বিভাগের কর্মীরা। তালিম আর নারীবান্ধব সেবা নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনী মাঠ তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন তারা। বিপুল সংখ্যক নারী ভোটার টানতেই চলতি বছরের শুরুতে জামায়াতের নারী কর্মীরা জোরেসোরে মাঠে নামেন। এর আগে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ একান্ত সাংগঠনিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল। প্রকাশ্যে তাদের খুব একটা দেখা যেত না।
গত ৩১ আগস্ট নির্বাচন কমিশন (ইসি) ২০২৫ সালের হালনাগাদ খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, দেশের মোট ভোটার ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার ৫০৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪১ লাখ ৪৪৫ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২২ লাখ ৫ হাজার ৮১৯ জন। ইসির এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নারী ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের অর্ধেকের কাছাকাছি।
জামায়াতের নারী কর্মীরা ডাকছেন ধর্মীয় আলোচনা। ধর্মীয় আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে চলছে ভোটের প্রচার। প্রচারণার এই কৌশলে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নারী ভোটাররাই প্রধান টার্গেট জামায়াতে ইসলামীর। এই টার্গেটে বহু আগে থেকেই চলছে কার্যক্রম। ফলে নারীদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে তাদের ভোট। বিপরীতে পিছিয়ে পড়ছে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো। নারী ভোটারদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী আর আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নেওয়ার কাজ করছে জামায়াত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাঁচ দফার আন্দোলনের সাথে জামায়াত কার্যত তৃণমূল পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারের কাজ করছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে নেতাকর্মীদের মাঠে নামিয়ে সমর্থকদের সক্রিয় করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিও আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে তারা।
অপরদিকে বিএনপি ও অন্য দলগুলোকে ব্যস্ত রেখেছেন নানা ইস্যুতে। জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে কোনো সংশয়-শঙ্কা নেই। আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারই ভিত্তিতে ৩০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীও ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গণসংযোগ, মতবিনিময় সভা এবং উন্নয়ন ইস্যু নিয়ে জনগণের কাছে প্রার্থীদের তুলে ধরছেন। জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছেন। তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে অনলাইন ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতিও চলছে জোরেশোরে।
রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলাম। সম্প্রতি বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করলেও প্রচারণা নেই তারা। নির্বাচনী এলাকাজুড়ে জামায়াতের মনোনিত প্রার্থীদের পোস্টার-ফেস্টুনও চোখে পড়ছে। তবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের পক্ষে আনতে চলছে চেষ্টা। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন জামায়াতের নারী বিভাগের কর্মীরা। নারীদের কাছে গিয়ে ইসলামী সভার দাওয়াত দিচ্ছেন তারা। আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকছেন ৪০-৫০ জন করে নারী। অংশগ্রহণকারী কারও না কারও বাসাতেই হচ্ছে এই আয়োজন। সেখানে কুরআন-হাদিস নিয়ে চলছে আলোচনা। আয়াত আর সুরার বিশ্লেষণে বোঝানো হচ্ছে ইহকাল-পরকাল। বাছাই করা সুরার বাংলা অনুবাদে কৌশলে দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। পরকালে বেহেশত পেতে হলে ইহকালে থাকতে হবে ইসলামের সঙ্গে। আর ইহকালের জীবনে যেহেতু রাজনীতি আর নির্বাচনও অন্তর্ভুক্ত, তাই কোথায় ভোট দিতে হবে, তা বলা হচ্ছে আকারে-ইঙ্গিতে।
মহানগরীর ধরমপুর এলাকার বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গৃহকর্তা বলেন, আমাদের এলাকায় তো বহু বছর ধরে নারীরা ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করে। স্থানীয়ভাবে আমরা যাকে জানি ‘তালিম’ নামে। এসব তালিমে থাকেন কেবল নারীরা। যেহেতু ধর্মীয় বিষয় আর কোনো পুরুষ থাকে না, তাই এ নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি। কিন্তু এখন তো শুনছি এটা নাকি জামায়াতের প্রচারণা। আর তারা কৌশল হিসেবে ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছেন।
নাম-পরিচয় না প্রকাশের অনুরোধ করে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেন, কয়েকজন নারী এসে আমার এলাকায় ধর্মীয় সভার দাওয়াত দিয়ে গেছেন। যারা দিয়েছেন তারাও এখানকার বাসিন্দা। জামায়াত যে তৃণমূলের কতটা গভীরে গেছে, তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না।
তবে জামায়াতের প্রচারণার বিষয়ে মহানগর বা জেলার দায়িত্বশীল কেউই কথা বলতে রাজি হননি। তাই এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।#