প্রেষণে বদলি নিয়ে রাবিতে দ্বৈত নীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রেষণে বদলি সুবিধা নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি)। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষকদের প্রেষণ বদলি সুবিধা নিয়ে বিভ্রান্তি ও প্রশাসনিক অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। মন চাইলে অন্য কোথাও দায়িত্ব পালনের জন্য কাউকে কাউকে দেওয়া হচ্ছে প্রেষণে। আবার কেউ এ সুবিধা পাচ্ছেন না রহস্যজনক কারণে।
প্রশাসনের এমন দ্বৈত নীতির কারণে শিক্ষকদের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান ও নীতি প্রত্যাশা করছেন। রাবির ১৯৭৩ সালের মূল বিধি অনুযায়ী, কোনো শিক্ষককে সরকার যদি বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিয়োগ দেয়, তবে সেই কর্মকাল প্রেষণ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু ২০১৩ সালে এক বিশেষ কমিটির মাধ্যমে এই বিধির সংশোধন করে প্রেষণের সুযোগ সীমিত করা হয়।
তৎকালীন উপাচার্য (ভিসি) ড. এম আব্দুস সোবহান সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে নিয়ম করেন, কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানে গেলেই প্রেষণ দেওয়া হবে। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অথচ আইনটি প্রণয়নকারী অধ্যাপক সোবহান নিজেই পরবর্তীতে সেটি ভঙ্গ করেন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি শরীয়তপুরের জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌসকে প্রেষণ অনুমোদন দেন। অথচ জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রেষণ ২০১৩ সালের সংশোধিত বিধি অনুযায়ী নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন তীব্র সমালোচনা হয়।
বর্তমানে বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাবির ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশিক মোসাদ্দিক। তিনি অবশ্য প্রেষণ পাননি। দেড় বছর আগে তৎকালীন ভিসি গোলাম সাব্বির সাত্তার তপুর সময়ে সিন্ডিকেট সভা তার জন্য মঞ্জুর করেছে লিয়েন। এই লিয়েনও বাতিল করে তাকে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। এ বছরই তার লিয়েন শেষ হবে বলে সম্প্রতি তাকে চিঠি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাকে তো প্রেষণ দেওয়া হয়নি। দেড় বছর আগের প্রশাসন আমাকে লিয়েন দেয়। সেটি নিয়েই আছি। বর্তমান প্রশাসন আবার চিঠি দিয়েছে যে এ বছরই লিয়েন শেষ হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, ১৯৭৩ সালের এই বিধির উদ্দেশ্য ছিল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা। মূল আইনে কোথাও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো বৈষম্যমূলক ধারা ছিল না। কিন্তু এখন যা খুশি তা-ই হচ্ছে। আইন একদিকে প্রয়োগ করা হবে, অন্যদিকে ভঙ্গ করা হবে- এটি গ্রহণযোগ্য নয় বলেই তাদের মত।
প্রশাসনের একটি অংশের যুক্তি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণের সুযোগ দিলে দক্ষ শিক্ষকরা স্থায়ীভাবে সরে যেতে পারেন। এতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল সংকট দেখা দিতে পারে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণে গেছেন, তারা নতুন পরিবেশে প্রশাসনিক ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফিরে এসে মূল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন।
শিক্ষকেরা বলছেন, ২০১৩ সালের সংশোধনের মাধ্যমে একদিকে একাডেমিক স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে, অন্যদিকে উপাচার্যের হাতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাড়তি ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া যে শিক্ষককে রাষ্ট্রপতি বা চ্যান্সেলর নিয়োগ দেন, তাঁকে ডেপুটেশন হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা। সংশোধনীতে ধোঁয়াশা থাকায় একাধিক উপাচার্য ব্যক্তিগত বিবেচনায় প্রেষণ অনুমোদন দিয়ে আসছেন, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘প্রেষণ নিয়ে আসলে বিশৃঙ্খলা চলছে। সিন্ডিকেটের উচিত ২০১৩ সালের সংশোধিত অর্ডিন্যান্স দ্রুত বাতিল করা এবং সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে সমানভাবে প্রেষণের সুযোগ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এমন নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যা আগামীতে কোনো ব্যক্তিগত বিবেচনায় পরিবর্তনযোগ্য হবে না।’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদকে কয়েকদফা ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘এ বিষয়টা আমাকে দেখতে হবে। পুরোপুরি না দেখে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’