চারঘাটে গাছ থেকে রস সংগ্রহে আগাম কর্মযজ্ঞ শুরু

নজরুল ইসলাম বাচ্চু, চারঘাট:
খেজুরের রস ও গুড়ের জন্য বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী জনপদ রাজশাহীর চারঘাট। আসন্ন শীত সামনে রেখে চারঘাটের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে চলছে গাছিদের তুমুল প্রস্তুতি। খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেলেও থেমে নেই রস সংগ্রহের চেষ্টা। তবে বছর বছর গাছির সংখ্যাও কমছে। এদিকে খেজুর রস জ¦ালানো, গুড় তৈরি ও বাজারজাতকরণের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে।
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার চারঘাট, সরদহ, ভায়ালক্ষীপুর, শলুয়া, নিমপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চলছে খেজুর গাছ প্রস্তুতের কাজ। সকাল হলেই ঠুঙ্গি, বাইলধারা, দড়ি, গাছিদা হাতে মাঠের পানে ছুটছেন গাছিরা। ধারালো দা দিয়ে নিপুন হাতে খেজুর গাছের মাথা পরিষ্কার করছেন তারা। খেজুর গাছের মাথা পরিষ্কার করার পরে দুই সপ্তাহের বিশ্রাম দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে আসছে শীতে, খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির মহাযজ্ঞকে ঘিরে কৃষকের চোখে মুখে যেন স্বপ্নের মাখামাখি।
উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের চকগোচর গ্রামের গাছি রাসেল জানান, অন্যান্য বছর কার্তিক মাস শুরু হওয়ার দশ দিন আগে থেকেই খেজুর গাছ প্রস্তুত করি। কিন্তু এবছর বৃষ্টি বাদলের কারণে খেজুর গাছ (কাটা) তোলার সময় সপ্তাহখানিক পিছিয়ে গেছে। কার্তিক মাসের দ্বিতীয় দশক থেকে রস সংগ্রহ শুরু হবে। প্রথম দিকে উৎপন্ন রস দিয়ে তৈরি করা হবে নলের গুড়।
জানা গেছে এ উপজেলা খেজুর গুড় ও রস ঐতিহ্যের ভাগিদার। প্রতি বছর এখান থেকে অন্তত ১.৫’ শ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদন করা হয়। প্রাকৃতিক ও নিরাপদ উপায়ে গ্রামের গাছিরা এসব গুড় তৈরি করেন। খেজুরের কাঁচা রসেরও জনপ্রিয়তাও ব্যাপক। সারাদেশেই খেজুর গুড়, রস ও পাটালির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চারঘাট থেকে এসব রস, গুড় ও পাটালি সারাদেশে সরবরাহ করা হয়।
উপজেলার ভায়ালক্ষীপুর ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের নাসিম নামের গাছি বলেন, এখন গাছ কমে যাচ্ছে। যা দু চারটে গাছ আছে তা কেউ কাটতে চায় না। আমার বয়স ৫৫ বছরের ওপরে। এখনো গাছ কেটে রস বানাই। খেজুরের রস ও গুড় আমাদের কাছে ঐতিহ্যের বিষয়। এটা হারিয়ে গেলে তো গ্রামের সৌন্দর্য থাকে না। তাই, এখনো শীত এলে খেজুর গাছ কাটি। গ্রামের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নতুন করে খেজুর রোপণের বিকল্প নেই।
উপজেলার বামনদিঘা গ্রামের গৃহবধূ রোকেয়্া বলে, আর মাত্র ৮-১০ দিন পর থেকে বাড়িতে খেজুরের রস আসবে। রস জ¦ালানোর বড় চুলা তৈরি করেছি। খড়ি-কাঠি গুছিয়ে রেখেছি। বাড়ির পুরুষ মানুষেরা রস মাঠ থেকে এনে দেয়, আমরা বাড়িতে বসে জ¦াল করি। এতে বছরে বাড়তি কিছু টাকা রোজগার হয়। শীতকালে পিঠা-পায়েস খেতেও তো গুড় লাগে। আমরা নিজেরা খেজুর গুড় দিয়ে পিঠাপুলি, পায়েস, ক্ষীর, জিলাপী, মিষ্টি সব কিছু করি। শহর থেকে মানুষ এসে গুড় কিনে নিয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, নিরাপদ উপায়ে খেজুর রস সংগ্রহ, গুড় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে গাছিদের বিভিন্ন ুতথ্য মাঠ পর্যায়ে প্রদান করছি। এ উপজেলা খেজুর গুড় ও রসের জন্য বিখ্যাত জনপদ। এবছর খেজুর গুড়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অন্তত ১.৫’ শ মেট্রিক টন। এর মধ্যে উপজেলার সকল এলাকায় গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করে ফেলেছেন। আগামী সপ্তাহ থেকে রস সংগ্রহ শুরু হয়ে যেতে পারে। আমরা গাছিদের সার্বিক খোঁজখবর রাখছি।