রাজশাহীতে আলুর রেকর্ড দরপতন!

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজারে আলুর দাম তলানিতে ঠেকেছে, ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। খেত থেকে শুরু করে হিমাগার পর্যন্ত সর্বত্রই লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকারের আলু কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা আরো গভীর হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর আলুচাষী ও ব্যবসায়ীরা।
পাইকারি বাজারে আলুর দাম এখন কেজিপ্রতি ১০-১১ টাকা, যেখানে গত বছর ছিল ৪৫-৫৫ টাকা। স্থানীয় খুচরা বাজারে দাম ২০-২৫ টাকা, যা গত মাসের তুলনায় ৭-১০ টাকা কম। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উৎপাদন খরচের একটি ভগ্নাংশও তুলতে পারছেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর রাজশাহী জেলায় ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ১০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এটি জেলার বার্ষিক চাহিদা ১ লাখ ১৩ হাজার ১৪৫ মেট্রিক টনের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি। গত বছরের তুলনায় এবার ৩ হাজার ৫৪৫ হেক্টর বেশি জমিতে আলু চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন বেড়েছে ৯১ হাজার ৬৯৩ মেট্রিক টন। এই অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দর পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যে জানা যায়, রাজশাহীতে ৩৯টি কোল্ড স্টোরেজের মধ্যে ৩৭টি সচল, যেখানে মোট ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন। এবার ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯১ মেট্রিক টন আলু মজুত করা হয়, যার মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন সবজি আলু এবং ৭৩ হাজার ৭৫৯ মেট্রিক টন বীজ আলু। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন আলু কোল্ড স্টোরেজে মজুত রয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম এতটাই কম যে, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু তোলার খরচও উঠাতে পারছেন না, ফলে অনেকে মজুত আলু তুলছেন না।
তানোরের কৃষক মোজাম্মেল হক টুটুলের অভিজ্ঞতা এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি ১৬৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে ৯ হাজার ৩৪৮ বস্তা আলু উৎপাদন করেছেন, যার মোট খরচ ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সরকারের আলু কেনার ঘোষণার অপেক্ষায় তিনি দুই হাজার বস্তা আলু বিক্রি বন্ধ রাখেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং দাম ধসে পড়ায় তার দুই হাজার বস্তা আলু এখনো কোল্ড স্টোরেজে পড়ে আছে। তিনি বলেন,“সরকার বলেছিল আলু কিনবে, কিন্তু এক বস্তাও কেনেনি। ভেবেছিলাম সরকার কিনবে, তাই আলু তুলিনি। এখন লোকসানে ডুবে আছি। তাই হিমাগার থেকে আলু তুলতে পারছি না।”
গত আগস্টে সরকার হিমাগার গেটে ন্যূনতম ২২ টাকা দামে ৫০ হাজার টন আলু কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, এই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
জেলা আলু চাষী ও ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিঠু হাজী বলেন, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তাদের যে খরচ হয়েছে তার তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এই লোকসান থেকে উঠে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। তিনি আরও বলেন,“সরকার কথা দিয়েছে, কিন্তু এক কেজিও কেনেনি। আমরা এখন কী করব?”সমাধানের পথ কোথায়?
জেলা আলু চাষী ও ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী আলুর দরপতনের মোটাদাগে তিনটি কারণের কথা জানিয়েছেন। এগুলো হলো- অধিক ফসল, হিমাগারে আলু পচে যাওয়া, দাম কম পাওয়া।
তিনি বলেন,“এক কেজি আলু উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া ও পরিবহণ খরচসহ ৩৫ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ১০-১১ টাকায়। পাইকারি দাম কম হওয়ায় হিমাগার থেকে আলু তুলে বাজারে নেওয়ার খরচও উঠছে না। অনেকে আলু হিমাগার থেকে তুলতে পারছেন না। এতে প্রতি কেজিতে ২২-২৫ টাকা লোকসান হচ্ছে।”
বাজারে আলুর দর পতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজশাহী বিভাগের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহানা আখতার জাহান বলেন, চলতি মৌসুমে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমে গেছে। গত বছর আলুর দাম বেশি থাকায় কৃষকেরা এবার বেশি পরিমাণে আলু চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত বছর জেলায় আলু চাষের জমির পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৯৫৫ হেক্টর। এবছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টরে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ৩ হাজার ৫৪৫ হেক্টর বেশি জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। একইভাবে উৎপাদনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। গতবছর যেখানে উৎপাদন হয়েছিল ৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন, এবছর তা বেড়ে হয়েছে ১০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন। যা আগের বছরের তুলনায় ৯১ হাজার ৬৯৩ মেট্রিক টন বেশি।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহী জেলার উদ্বৃত্ত আলু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে এবার দেশের সব জেলাতেই আলুর উৎপাদন বেড়েছে। ফলে সারাদেশে মোট উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হয়েছে, যা আলুর দর পতনের মূল কারণ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, জেলায় আলুর মোট চাহিদা প্রায় ১ লাখ ১৩ লাখ ১৪৫ মেট্রিক টন। কিন্তু এবছর ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৭ মে. টন আলু উৎপাদন হয়েছে, যা বার্ষিক চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে বাজারে আলুর দরপতন হয়েছে।