রাকসু নির্বাচনে প্রচারণা শেষ, অপেক্ষা ভোটগ্রহণের, প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে গঠনতন্ত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক:
৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। এর মধ্যে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। আর এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির করছেন নানা প্রতিশ্রুতি। প্রার্থীরা ইশতেহারে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ, আবাসন সংকট নিরসন, খাবারের মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংস্কার-বাদ দেয়নি কিছু। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ির বিপরীতে রাকসুর গঠনতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে। গঠনতন্ত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রার্থীদের ইশতেহারের অনেকখানিই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে সিদ্ধান্ত নেবে তা অনুমোদন হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের হাত ধরে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্যানেলগুলোর ইশতেহার বেশ উচ্চাভিলাষী। ১০ বছরের অ্যাকাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে প্রশাসনকে বাধ্য করা এবং অ্যালামনাইদের সহায়তায় হল নির্মাণে তহবিল গঠনের কথা বলছে ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’। ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ ১২ মাসে ২৪টি সংস্কারের কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে শতভাগ আবাসিক করার রোডম্যাপ, আবাসন ভর্তুকি এবং শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা।
অন্যদিকে বামপন্থী ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’ প্যানেলের ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের ১০ শতাংশ গবেষণা খাতে বরাদ্দ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা এবং ক্যাম্পাস শাটল সার্ভিস চালুর মতো দাবিগুলো সামনে এনেছেন। প্রায় সব প্যানেল ও প্রার্থীই নিয়মিত রাকসু নির্বাচন এবং উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার মতো মৌলিক সংস্কারের কথা বলছে। প্রার্থীরা সংস্কারের আলাপ তুললেও রাকসুর গঠনতন্ত্র ভিন্ন কথা বলছে। গঠনতন্ত্রে মূলত প্রশাসনের হাতেই ক্ষমতা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে উপাচার্যের। পদাধিকারবলে রাকসুর সভাপতি হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
গঠনতন্ত্রের ৭ (১)(ই) ধারা অনুযায়ী, সভাপতির (উপাচার্য) অনুমোদন ছাড়া নির্বাহী কমিটির কোনো সিদ্ধান্তই বৈধ হবে না। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে যাদের নির্বাচিত করবে, তাদের নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ছাড়পত্র আসতে হবে উপাচার্যের দফতর থেকে।
এর চেয়েও শক্তিশালী ধারা হলো ৭(১)(সি)। এই ধারা অনুযায়ী, উপাচার্য সংসদের ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ যেকোনো সময় যেকোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করতে পারেন। এমনকি তিনি পুরো নির্বাহী কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনেরও ডাক দিতে পারেন। এখানে ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ কী, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং, প্রশাসনের সঙ্গে মতের অমিল হলে পুরো ছাত্র সংসদই ভেঙে দেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা উপাচার্যের হাতে রয়েছে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রাকসুর ক্ষমতা বেশ সীমিত হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এর কাজ করার সুযোগ রয়েছে। গঠনতন্ত্র মোতাবেক, রাকসুর মূল কাজের ক্ষেত্র হলো সহশিক্ষা কার্যক্রম। ধারা ২ এবং ৭ অনুযায়ী, রাকসুর বিভিন্ন সম্পাদক, যেমন ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক, বিতর্ক ও সাহিত্য—নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম আয়োজন করতে পারেন।
সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ‘হামদ, নাত, কাওয়ালি’ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি কিংবা অন্যান্য প্যানেলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নযোগ্য। প্রকাশনা সম্পাদকের আওতায় ম্যাগাজিন বা জার্নাল প্রকাশ করাও রাকসুর ক্ষমতার মধ্যে পড়ে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজনের ক্ষমতাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদকের রয়েছে। মূলত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন জোরদার করতে রাকসু গঠনতন্ত্র অধিক জোর দিয়েছে। আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন বা খাবারের ভর্তুকির মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মূল দাবি। প্রার্থীরাও এগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু গঠনতন্ত্রে এগুলো করবার এখতিয়ার রাকসু প্রতিনিধিদের হাতে রাখা হয়নি। অনেকেই তাই রাকসু প্রতিনিধিদের বাস্তবায়নকারী নয়, বরং চাপ প্রয়োগকারী হিসেবে দেখছেন।
সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদের ইশতেহারের শুরুতেই লেখা ছিল, ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্র প্রতিনিধিদের মেয়াদকাল এবং কর্মপরিসর খুবই স্বল্প। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে শুধু অবকাঠামোকেই উন্নয়ন হিসেবে হাজির করা হয়েছিল। এই সময়েও আমরা দেখেছি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনেক মুখরোচক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেখা যাচ্ছে, যা ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।’ প্যানেলটি তাই নিজেদের ইশতেহারে অনেকক্ষেত্রেই সরাসরি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে চাপ প্রয়োগের কথা বলেছে।
সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদের ভিপিপ্রার্থী তাসিন খান বলেন, ‘রাকসু আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু এর গঠনতন্ত্র আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি। আমরা যখন রাকসুকে শিক্ষার্থীদের সংগঠন হিসেবে কল্পনা করি, তখন দেখি এই গঠনতন্ত্রে নেতৃত্বের অধিকার সম্পূর্ণ ছাত্রদের হাতে নেই। উপাচার্য পদাধিকার বলে সভাপতি হন, অথচ আমাদের কণ্ঠ, আমাদের প্রতিনিধি সেখানে অনুপস্থিত। এটা আমাদের কাছে বেশ অগণতান্ত্রিক মনে হয়।’
তাসিন অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচনের কোনো স্থায়ী সময়সূচি নেই। ফলে প্রশাসন যখন ইচ্ছা, তখন নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। ছাত্রদের অধিকার যেন এক অনিশ্চয়তার খাঁচায় বন্দি। আমরা চাই একটি স্বচ্ছ, নির্ধারিত নির্বাচনকাল, যেখানে ছাত্ররা জানবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন কবে হবে।’
প্রার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হলো গঠনতন্ত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করার পথটা বেশ জটিল। গঠনতন্ত্রের ধারা ১৬ অনুযায়ী, এটি সংশোধন করতে হলে রাকসুর মোট সদস্যের অর্ধেকের স্বাক্ষরসহ প্রস্তাব জমা দিতে হবে। এরপর সাধারণ সভায় মোট সদস্যের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তা পাস করাতে হবে।
রাকসুর গঠনতন্ত্রে প্রশাসনের সর্বময় ক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এফ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। আমরা এখন নির্বাচন নিয়ে কথা বলি। প্রার্থীদের যদি গঠনতন্ত্র নিয়ে সমস্যা হয়, তাহলে তাঁরা নির্বাচিত হওয়ার পর গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে পারবে।’
শেষ দিনের প্রচারে ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রচার শেষ হয়েছে মঙ্গলবার রাত ১২টায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাত ১২টা পর্যন্ত প্রার্থীরা প্রচার চালাতে পারবেন। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ।
শেষদিনের প্রচারকে ঘিরে পুরো ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, জানাচ্ছেন নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি। বিভিন্ন বিভাগের সামনে ও আবাসিক হলগুলোতে চলছে প্রার্থীদের সরাসরি প্রচার, পোস্টার ও হ্যান্ডবিল বিতরণ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়।
প্রচারণার শেষ দিন হিসেবে মঙ্গলবার সকাল থেকে প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রচারণায় অংশ নিয়েছে ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’, ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সংসদ’, ছাত্র অধিকার ও ছাত্র ফেডারেশন-সমর্থিত ‘রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ’, বামধারার ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদসহ ১১টি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
বিশেষ করে ক্যাম্পাসের আমতলা, পরিবহন মার্কেট, বুদ্ধিজীবী চত্বর, শহিদ মিনার, চারুকলা ও কৃষি অনুষদ, পশ্চিম পাড়া এলাকা এবং বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে প্রার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে প্রচার চালানোর সময় কথা হয় রাকসুর ইতিহাসে প্রথম নারী ভিপি পদপ্রার্থী তাসিন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রচারের শেষ দিন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি সবার কাছে পৌঁছাতে। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতা হলো, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এখনো সবার কাছে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক হাতে সবকিছু সামলাতে হয়Ñএটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ।
এসময় ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী শেখ নূর-উদ্দীন আবীর বলেন, আমাদের প্যানেলের বৈচিত্র্যতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক সাড়া দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীরা আমাদের ভালোভাবে গ্রহণ করছেন। কারণ তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে আমরা আন্দোলন করেছিলাম। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে। আর যারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।
আমতলায় প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। প্রচারের তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ফলে ক্যাম্পাসে বাড়তি আমেজ তৈরি হয়েছে। বারবার নির্বাচন পেছানোয় আমরা দীর্ঘ সময় পেয়েছি প্রচারের জন্য। শিক্ষার্থীদের কাছে কয়েকবার যাওয়া হয়েছে, তারাও আমাদের সাদরে গ্রহণ করছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি।
অনেক বছর পর নির্বাচন হওয়ায় ভোট কাস্টিংয়ের হার সম্পর্কে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, আশা করি, সবকিছু ঠিক থাকলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ভোট দিতে আসবেন।
রাকসু নির্বাচনে ২৩টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৪৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে ১৮, জিএস পদে ১৩ এবং এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৬ জন। ছাত্রদল ও শিবির সমর্থিতসহ মোট ১১টি প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের ৫টি পদে ৫৮ জন প্রার্থী এবং হল সংসদ নির্বাচনের ১৫টি পদের বিপরীতে ১৭টি হলে মোট ৫৯৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাকসু ও সিনেট নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১১ হাজার ৩০৫ এবং পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৫৯৬ জন। পুনর্বিন্যস্ত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১৬ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গণনা শেষে সেদিনই ফলাফল ঘোষণা করা হবে।