চর অনুপনগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেলে না ওষুধ, ইউপি কার্যালয় ঘেরাও

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
একই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কর্মরত স্বামী-স্ত্রী ও বোন। এরমধ্যে স্ত্রী কর্মরত প্রায় ১৪ বছর ধরে। স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই বসবাস করেন পরিবার নিয়ে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকা ওষুধ রাখার ফ্রিজে রাখা হয় মাছ-মাংস। ওষুধ নিতে আসলে ফিরিয়ে দেয়া হয় রোগীদের। অফিসেও ঠিকমতো পাওয়া যায় না কর্মরত স্টাফদের। এনিয়ে দফায় দফায় অভিযোগ দিলেও মেলেনি সুরাহা। এমন অবস্থায় এসব অভিযোগ তুলে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ঘেরাও করে স্থানীয় জনতা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার চরঅনুপনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিক্ষুব্ধ জনতা চরঅনুপনগর ইউনিয়ন পরিষদ ঘেরাও করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদ জানান। এসময় তারা ইউপি চেয়ারম্যান ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল বাদীর বিরুদ্ধে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেয়। এমনকি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অনিয়মের পক্ষে সহযোগিতার অভিযোগ তুলেন তারা। পরে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রে সমবেত হোন স্থানীয় জনতা।
বিক্ষুব্ধ জনতা ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত প্রায় ১৪ বছর ধরে চর অনুপনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মোছা. সুমাইয়া আক্তার। একই কর্মস্থলে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক তার স্বামী আশিকুল হাবীব ও পরিবার কল্যান সহকারী তার ননদ হিরা খাতুন। তাদের অভিযোগ, পুরো পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি। রোগীরা আসলে ঘুরিয়ে পাঠানো হয়। ওষুধ নেই বলা হয় বেশিরভাগ সময়ই। এমনকি রোগীদের সাথেও করা হয় দুর্বব্যহার।
পঞ্চাশোর্ধ তরিকুল ইসলাম বলেন, অনিময় ও অবব্যস্থাপনার আরেক নাম চরঅনুপনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। সেখানে কোন চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়না। আমরা এসব অভিযোগ নিয়ে দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। তবুও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। এমনকি স্থানীয়রা সবাই মিলে হাসপাতালের ফ্রিজে মাছ উদ্বারও করেছি। চেয়ারম্যানকে বারবার বললেও তিনি কোন ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের পক্ষেই অবস্থান করছেন।
যুবক ফয়সাল আহমেদ জানান, হাসপাতালে নিয়মিত আসেন না পরিবাার পরিকল্পনা পরিদর্শক আশিকুল হাবীব। তার নিজস্ব খামার নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে, টাকার বিনিময়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন৷ ইউপি চেয়ারম্যান যেহেতু সেখানকার সভাপতি, তাই ইউনিয়ন পরিষদ ঘেরাও করে তার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনসাধারণ। বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। অবস্থার পরিবর্তন না হলে আগামীতে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, এখানে চিকিৎসা নিতে গেলেই নাই বলে ফেরত পাঠায়। অথচ এসব ওষুধ বাইরে পাওয়া যায়। আমি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩-৪ বার গেলেও প্রত্যেকবার ওষুধ না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে৷ কার কাছে যাব, কোথায় গেলে আমরা সঠিক চিকিৎসা পাব, তা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
এনিয়ে চর অনুপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাদী বাদশা বলেন, স্থানীয়রা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে আমাকে জানিয়েছে। তবু তারা লিখিত অভিযোগ দিলে তা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তাছাড়া তাদের এখান থেকে সরিয়ে দেয়া বা বদলী করার বিষয়টি আমার এখতিয়ার বর্হিভূত। কিছু মানুষ না বুঝেই, আমার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এসে স্লোগান দিচ্ছে।
জনসাধারণের অবস্থান নেয়ার সময় এনিয়ে কথা বলতে চরঅনুপনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গেলেও উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মোছা. সুমাইয়া আক্তার, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক আশিকুল হাবীব ও পরিবার কল্যান সহকারী হিরা খাতুন কাউকেই পাওয়া যায়নি। তবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মিনাল কুমার সাহা বলেন, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে গত ৯ মাস ধরে ওষুধ বরাদ্দ না থাকায় রোগীদের দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগে যেসব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে, তা সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়।
সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন চর অনুপনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক আশিকুল হাবীব। তিনি জানান, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি আমার বসতবাড়ি কিছু অংশ মসজিদের নামে ঘিরে নেয়। এনিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছি। তাই ক্ষুব্ধ হয়ে এসব মিথ্যা বানেয়াট অভিযোগ করা হচ্ছে আমার পরিবারের নামে। আমি আমার বোন ও স্ত্রী নিয়ম মেনেই কর্মস্থলে কর্মরত থেকে কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, গত ৯ মাস থেকে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ওষুধ পাওয়া যায় না, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিতরণ করা যায়নি। তবে অন্যান্য সেবা স্বাভাবিক রয়েছে। আমি এখান থেকে না গেলে প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এনিয়ে পরিবার নিয়ে বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে জানান আশিকুল ইসলাম।
এনিয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. শুকলাল বৈদ্য জানান, চরঅনুপনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ইনসট্রাক্টরের সাথে স্থানীয়দের কিছু মানুষের পারিবারিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর সূত্র ধরেই তারা কয়েকবার আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছিল। আমি বদলীর জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পত্র দিয়েছি।
ওষুধ না দেয়ার বিষয়ে তিনি আরও জানান, ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের ওষুধপত্রের কোন বরাদ্দ ছিল না প্রায় ১ বছর। তবে যেসব ওষুধপত্র পাওয়া গেছে তা দিয়েই যথাযথভাবে সেবা প্রদান করা হয়েছে। আশা করছি, খুব কম সময়ের মধ্যে আমরা হাতে ওষুধ পাব ও আগের মতো প্রায় ২২ রকমের ওষুধ বিতরণ করা হবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থেকে।