শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

জাকসু নির্বাচন : বর্জন, অনাস্থায় পুনঃনির্বাচনের দাবি

WP Import ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩২ অপরাহ্ন জাতীয়
WP Import ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩২ অপরাহ্ন
জাকসু নির্বাচন : বর্জন, অনাস্থায় পুনঃনির্বাচনের দাবি
জাকসু নির্বাচন : বর্জন, অনাস্থায় পুনঃনির্বাচনের দাবি

সোনার দেশ ডেস্ক:


বিশৃঙ্খলা ও অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের পরও কিছু হলে ভোট নেওয়া হয়েছে। রাত ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে। জাকসুতে সবচেয়ে বেশি ভোটার এই হলে ৯৯১ জন। তবে রাত ১০টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি।

তবে নির্বাচনের শেষের দিকে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল। এছাড়া নির্বাচনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল। অন্যদিকে নির্বাচনে বেশকিছু অসংগতির অভিযোগও তুলে ধরেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল।

বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের পরও কিছু কেন্দ্রে লম্বা লাইন পড়ে। এ কারণে কেন্দ্র চত্বরে উপস্থিত থাকা ভোটারদের জন্য ভোটগ্রহণের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে কেন্দ্রের বাইরে সাড়ে পাঁচটার দিকে দুই শতাধিক ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার বলেন, ‘ভোট গ্রহণে দেরি হওয়ার বিষয়ে এখনও আমরা জানি না। ভোটকেন্দ্র থেকে রিটার্নিং অফিসাররা আমাদের কোনো আপডেট জানাননি।’
বেশ কিছু অভিযোগ এনে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল। মওলানা ভাসানী হলের অতিথি কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী তানজিলা হোসেন বৈশাখী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘এই নির্বাচন নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।’

নির্বাচন কমিশনকে ইঙ্গিত করে ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী স্মরণ এহসান বলেছেন, ‘এই নির্বাচন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হচ্ছে না। আমরা এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করছি।’
অন্যদিকে নির্বাচনে বেশকিছু অসংগতির অভিযোগও তুলে ধরেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল। বৃহস্পতিবার এই প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আরিফুল্লাহ আদিব এ অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘নির্বাচনে ইতিমধ্যে আমরা বেশকিছু অসঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি। একটি নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের যতটুকু প্রস্তুতি থাকা দরকার তার একটিও গ্রহণ করে নাই।’
বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হলে ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা। শহীদ তাজউদ্দিন হল, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও ফজিলাতুন্নেছা হলে ভোটগ্রহণে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থী ও প্রার্থীদের প্রতিবাদে দু’টি হলের মধ্যে একটিতে আধাঘণ্টা, আরেকটিতে একঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।

ভোট বর্জন ছাত্রদলের
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মওলানা ভাসানী হলের অতিথি কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী তানজিলা হোসেন বৈশাখী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘তাজউদ্দীন হলে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তালিকায় ভোটারদের ছবি নেই, ২১ নম্বর হলে মব সৃষ্টি করা হয়েছে। জাহানারা ইমাম হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর গায়ে হাত তোলা হয়েছে।’
এই নির্বাচন নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘জামায়াত নেতার সরবরাহকৃত ওএমআর মেশিন আমরা চাইনি। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত ব্যালটেই ভোট হচ্ছে।’
বৈশাখী বলেন, ‘মেয়েদের হলে একই মেয়ে বারবার ভোট দিতে গেছেন। শিবিরপন্থী সাংবাদিকরা মিস বিহ্যাভ করেছেন ছাত্রদলের প্রার্থীদের সঙ্গে, সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে না। এটি কারচুপি ও প্রহসনের নির্বাচন। তাই নির্বাচন বর্জন করতে বাধ্য হচ্ছি। নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের রায়ের প্রতিফলন হচ্ছে না।’
নির্বাচনে অনাস্থা সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের

নির্বাচনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল। নির্বাচন কমিশনকে ইঙ্গিত করে প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী স্মরণ এহসান লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ‘এই নির্বাচন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হচ্ছে না। আমরা এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করছি। আমরা বলতে চাই, তারা শুরু থেকেই আমাদের আস্থা, ভরসা ও আকাক্সক্ষার জায়গা নষ্ট করেছে।’
তিনি বলেন, সকাল থেকে কেন্দ্রগুলোতে নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতি চলছে। এই অনিয়মের শুরু সম্প্রীতির ঐক্যের ভিপি প্রার্থী অমর্ত রায়ের প্রার্থিতা জোরপূর্বক এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাতিল করার মাধ্যমে। এই অনিয়মের ধারাবাহিকতায় ভোট গ্রহণের চূড়ান্ত অনিয়ম এবং প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের সহকারী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারিয়া জামান নিকি বলেন, বিভিন্ন হলে প্রথম দুই-তিন ঘণ্টা নানা ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কিছু হলে বলা হয়েছে, পোলিং এজেন্টদের যে অ্যাপ্লিকেশন আছে সে অ্যাপ্লিকেশনে যে প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট, সে প্রার্থীর সাইন লাগবে। আবার কিছু হলে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থীর কেউ পোলিং এজেন্ট হতে পারবে না। প্যানেল থেকে মাত্র একজন পোলিং এজেন্ট হতে পারবে। রোকেয়া হলে বলা হয়েছে, পোলিং এজেন্ট হতে গেলে তার ছবি লাগবে। এই তিন হলের বক্তব্য একটার সাথে কিন্তু আরেকটা মেলে না।

পুনরায় নির্বাচনের দাবি চার প্যানেলের
দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন চার প্যানেলের প্রার্থীরা। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বরে চারটি প্যানেলের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেন ভিপি প্রার্থী স্মরণ এহসান। এতে সংহতি জানায় ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), সাংস্কৃতিক জোট ও ইন্ডেজেনাস স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল, ছাত্র ইউনিয়ন (ইমন-তানজিম) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ‘সংশপ্তক পর্ষদ’, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) প্যানেল।

লিখিত বক্তব্যে ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), সাংস্কৃতিক জোট ও ইন্ডেজেনাস স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী স্মরণ এহসান বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা, অব্যবস্থাপনা ও অথর্বতা এই সমগ্র নির্বাচনের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করেছি এই নির্বাচনকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ও নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ অসহযোগিতা, পক্ষপাতদুষ্টতা ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার চূড়ান্ত অনিচ্ছা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পোলিং এজেন্টদের কাজ করতে না দেওয়া, নারী হলে পুরুষ প্রার্থী প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, আঙুলে কালির দাগ না দেওয়া, ভোটার হওয়ার পরও তালিকায় নাম না থাকা, ভোটারের তুলনায় ব্যালট বেশি ছাপানো, লাইন জ্যামিং, বহিরাগতদের আনাগোনা ইত্যাদি অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে এই নির্বাচনকে ঘিরে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্নে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই দায় কেবল এবং কেবলমাত্র এই ব্যর্থ, অথর্ব এবং পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন আর প্রশাসনের। এই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াতেই নির্বাচনের ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় জাকসু নির্বাচন আমাদের আজীবনের দাবি। আমরা এই অনিয়মের নির্বাচনকে বয়কট করেছি এবং দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনঃনির্বাচনের দাবী জানাচ্ছি।

তিন শিক্ষককের ভোট বর্জন
ভোট বর্জন করে নির্বাচনি দায়িত্ব ছেড়েছেন তিন শিক্ষক। এ তথ্য জানিয়েছেন গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ও ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রভোস্ট নজরুল ইসলাম। বাকি দুই শিক্ষক হলেন- শামীমা সুলতানা ও নাহরিন ইসলাম খান।

নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা গতকাল (বুধবার) রাতে জানতে পেরেছি, বিশেষ একটি দলের ব্যক্তিকে ভোট গণনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে ব্যালট ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমরা জানতে পারি, তিনি দীর্ঘ সময় জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমরা গোয়েন্দার মাধ্যমে তথ্য নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করলে তারা এই মেশিনের মাধ্যমে ভোট গণনা থেকে সরে আসে। কারণ এতে বিতর্ক হতে পারে।

তিনি বলেন, এতে প্রতীয়মান হয়েছে, যে প্রক্রিয়া মাধ্যমে ভোটগ্রহণ এবং ব্যালটের দায়িত্ব যাদেরকে দেওয়া হয়েছে এটা প্রশ্নবিদ্ধ। জাকসুর ব্যালট পেপার কোথায় থেকে ছাপানো হয়েছে সাংবাদিকরা তার কাছে এটা জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, এটা তার প্রেস থেকে ছাপানো হয়নি। অথচ সাব কন্ডাক্টরের মাধ্যমে থার্ড পার্টির কাউকে দিয়ে এটা ছাপানো হয়েছে।
এই শিক্ষকের দাবি, এটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনে এত বরাদ্দ প্রয়োজনে আরও পাঁচ লাখ টাকা বেশি খরচ হতো। ১৫/২০ জন শিক্ষক রাগে দুঃখে বাসায় চলে গিয়েছেন। আমরা তিন জন প্রেসের সামনে কথা বলেছি এবং নির্বাচন বর্জন করেছি। এই নির্বাচনের আর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে কি না সেটি জাতি বিবেচনা করবে।