রামেক হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুন রোগী
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেল এক সপ্তাহ থেকে বেড়েছে রোগী। যার অধিকাংশ শীতজনিত রোগ নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। হাসপাতালে দ্বিগুনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। এর বেশিরভাগ রোগীই বৃদ্ধ ও শিশু। শ্বাসকষ্ট থেকে জ¦রের মতো রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন তারা।
রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গেল সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করে। ঘন কুয়াশা এবং তীব্র বাতাসের সঙ্গে শীতজনিত জটিলতার চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বাইরে মেডিকেলের বর্হিবিভাগেও রোগীর চাপ বেড়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, হাঁপানির জটিলতা, জ্বর, কাশি, সর্দি এবং ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। শয্যা সঙ্কটের কারণে সেভাবে যায়গায় দেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়াও জনবল ঘাটতির কারণে চিকিৎসা দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ১ হাজার ২০০ শয্যার ধারণক্ষমতার বিপরীতে ২ হাজার ৫৩৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গেল বছরের এসময়ে ২ হাজার ৬৬ জন রোগীর ভর্তি হয়েছিলেন।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার নজিপুর থেকে অসুস্থ মাকে রামেক হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন স্বাধীন। তিনি বলেন, সোমবার রাতে মাকে ভর্তি করা হয়েছিল। ওয়ার্ড থেকে কোন বেড দিতে পারেনি। বাধ্য হয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিঁড়ির পাশে রাখতে হয়েছে। এতে আরও কষ্ট বেড়েছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র এবং জরুরি বিভাগের ইনচার্জ চিকিৎসক শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, বেশিরভাগ রোগী শিশু এবং বয়স্ক। প্রতিদিন আমরা ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বেশি পাচ্ছি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু এবং শ্বাসকষ্টজনিত বয়স্ক রোগীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। বিলম্বিত চিকিৎসা এবং দীর্ঘক্ষণ ঠাণ্ডায় থাকার কারণে অনেক রোগী গুরুতর হয়ে উঠছেন।
তিনি আরও বলেন, জনবলের ঘাটতির সঙ্গে আবাসন সঙ্কটের কারণে সেবা দিতে কঠিন হয়ে পরছে। হাসপাতাল ৫০০ শয্যা থেকে ১ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও আগের জনবল দিয়ে চালানো হচ্ছে।
হাসপাতালের শিশু ইউনিটের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ বেশি ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ৫৩টি শয্যার বিপরীতে মোট ১৪৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ শিশু সাধারণ সর্দি, ব্রঙ্কিওলাইটিস, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ায় ভুগছিল। ঠাণ্ডা আবহাওয়া কারণে তারা বেশি অসুস্থ হয়ে আসছে। আমরা সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি।
বগুড়া, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা হাসপাতালগুলোতেও একই রকম পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। সেখানকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করছেন, গেল সপ্তাহ থেকে ঠাণ্ডাজনিত কারণে বহির্বিভাগে রোগীর উপস্থিতি এবং ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক নাজমুল হক বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ৫০০ শয্যা। কিন্তু বর্তমানে ১ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। যা আমাদের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। শয্যার সংকটের কারণে অনেককে মেঝেতে রাখা হচ্ছে। অঞ্চলজুড়ে ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে চাপ বাড়তে থাকে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট মাসুদ পারভেজ জানান, বর্তমানে হাসপাতালে মোট ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ২০ দিন আগে সংখ্যাটি ৩০০ এর নিচে ছিল। এখন তা বেড়ে প্রায় ৩৫০ জনে পৌঁছেছে। ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতার কারণেই মূলত এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালটি ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও কর্মীদের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। ১০০টি শয্যার জন্যও আমাদের পূর্ণ জনবল নেই। ডাক্তার এবং নার্স মিলে প্রায় ৫০ শতাংশ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
নওগাঁ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মীর সুফিয়ান বলেন, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে মোট ২২২ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ রোগী ঠাণ্ডাজনিত জটিলতায় ভুগছেন, বিশেষ করে শিশুরা। এই সময়ে আমরা ডায়াবেটিসজনিত কেসও বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি।
৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। রাজশাহীতে গেল দুইদিন থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বইছে।
একদিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা বেড়েছে রাজশাহীতে। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাজশাহীতে সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার (৭ জানুয়ারি) সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মৌসুমের সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রিতে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে চলেছে। ফলে শীতের অনুভূতি পুরোপুরি কাটেনি।
এ বিষয়ে রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম জানায়, ২৪ ঘণ্টায় তাপমাত্রা সামান্য বেড়েছে। সকালে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৬ শতাংশ। বুধবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ডিগ্রি সেলসিয়াস।