শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির স্বস্তির মাঝেই চমক দেখাতে চায় জামায়াত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির স্বস্তির মাঝেই চমক দেখাতে চায় জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) সংসদীয় আসনের নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। গ্রামগঞ্জ থেকে বাজার, হাট থেকে চায়ের দোকান, সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, কে হচ্ছেন শিবগঞ্জের পরবর্তী সংসদ সদস্য। স্থানীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ বলছে, এবার এ আসনে মূল লড়াই গড়াচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে।


জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। দলটির প্রার্থী হিসেবে এবারও মনোনয়ন পেয়েছেন প্রবীণ ও হেভিওয়েট নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া। শিবগঞ্জ রাজনীতিতে তার রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও আলাদা গ্রহণযোগ্যতা।


স্থানীয় সূত্র জানায়, জুলাই বিপ্লবের পর তৃণমূল পর্যায়ে অধ্যাপক শাহজাহান মিয়ার ধারাবাহিক তৎপরতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এবারে তার বিপক্ষে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। ফলে দলীয় বিভক্তির ঝুঁকি না থাকায় নির্বাচনী মাঠে তিনি বেশ স্বস্তিতেই রয়েছেন। তবে বিএনপির স্বস্তির মাঝেই চমক দেখাতে চায় জামায়াতে ইসলামী। এ আসনে দলটির প্রার্থী হয়েছেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমীর ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ কেরামত আলী। তিনি শুরু থেকেই মাঠে সক্রিয় এবং সংগঠনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধারাবাহিক প্রচারণা চালাচ্ছেন।


রাজনীতিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে জামায়াতের অতীত খুব একটা সুখকর নয়। সংসদ নির্বাচনে জয়ের নজির না থাকলেও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বদলে গেছে দলটির অবস্থান। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে জামায়াত বর্তমানে সবচেয়ে সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো ও নিবেদিত ভোটব্যাংকের কারণে এবার ভোটের অঙ্কে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে দলটি, ফলাফল যাই হোক না কেন।


ভোটার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণ মূলত বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়াকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা শিবগঞ্জের পরিচিত মুখ। এর আগে তিনি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।


অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া বলেন, এই আসন বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানুষ ধানের শীষেই ভোট দেবে। জনগণের ভোটে বিএনপির জয় হবে ইনশাআল্লাহ।


অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী ড. মোহাম্মদ কেরামত আলী বলছেন, সময় এসেছে পরিবর্তনের। তিনি বলেন, মানুষ দুঃশাসন থেকে মুক্তি চায়। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে তারা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায়।


এ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নবাব মো. শামসুল হুদা। বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট থেকে প্রার্থী হয়েছেন মো. আব্দুল হালিম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন মো. মনিরুল ইসলাম।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচনী ফলাফল মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে, ভোটারদের উপস্থিতি, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনের পরিবেশ ও সুষ্ঠুতা। একদিকে বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক শাহজাহান মিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, চারবারের সংসদ সদস্য হিসেবে তার পরিচিতি ও এলাকার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভোটের সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে; অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীর শক্তিশালী ও সংগঠিত ভোটব্যাংকও ফলাফলের ক্ষেত্রে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৯ হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৮৪ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৪৩৩ জন।


কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর এই এলাকার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। শিবগঞ্জ উপজেলা আম উৎপাদনের জন্যও দেশজুড়ে পরিচিত। তবে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা, নদীভাঙন, কর্মসংস্থানের অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখানকার মানুষের প্রধান সমস্যা।


বিশেষ করে পদ্মা নদীর তীরবর্তী পাঁকা, উজিরপুর, দুর্লভপুর ও মনাকষা ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের কবলে। এসব এলাকার মানুষের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।


স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এবার উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অবাধ, সুষ্ঠু ও নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ চান। একাধিক ভোটার জানান, যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দিতে পারব, এই নিশ্চয়তাই আগে দরকার।


তরুণ ভোটারদের বড় অংশ ভাবছেন কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ নিয়ে, আর বয়স্ক ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি সহায়তা। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এই এলাকায় মাদক নির্মূল বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে।


সব মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচন শুধু একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়, বরং এটি নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের রায়ে সীমান্তঘেঁষা শিবগঞ্জ উপজেলার প্রতিনিধিত্ব কার হাতে যায়, সেদিকেই তাকিয়ে এখন পুরো জেলা।