গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়ছে
সোমবার চট্টগ্রামের হালিশহরের একটি বাসায় জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় শিশুসহ ৭ জন অগ্নিদগ্ধ হয়। মঙ্গলবার পর্যন্ত আহতদের তিনজনের মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হয়েছে। এমন ঘটনা এখন প্রতিনেয়ত গঠছে। বিষয়টি ভাবাচ্ছে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিতই হয়ে আসছে।
সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এখন আর নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি যেন প্রতিদিনকার এক আতঙ্কের নাম, নিত্যদিনের মর্মান্তিক বাস্তবতা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত সারা দেশে ৩৩টিরও বেশি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৯ জন, আহত হয়েছে প্রায় ৯২ জনের অধিক। রান্নাঘর, দোকান কিংবা উৎসব যেখানেই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানেই যেন লুকিয়ে রয়েছে মৃত্যুর ফাঁদ। এই বিস্ফোরণ কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ, ভেঙে দিচ্ছে পরিবার, ধ্বংস করে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ।
দেশে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়লেও এর সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ, রি-টেস্টিং ও সচেতনতার অভাবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। মেয়াদোত্তীর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার, নিম্নমানের পাইপ ও রেগুলেটর ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় প্রায়শই প্রাণহানি, অঙ্গহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
জার্নাল অফ বার্ন অ্যান্ড কেয়ার প্রকাশিত একটি গবেষণায় ‘ডোমেস্টিক সিলিন্ডার ব্লাস্ট : অ্যা নেগলেক্ট টরপেডো’ শিরোনামে বলা হয়েছে, গৃহস্থালি পর্যায়ে ব্যবহারকারীদের গ্যাস সুরক্ষা বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান নেই। অনেকেই নিয়মিতভাবে রেগুলেটর পরিবর্তন করেন না, পাইপে ফাটল দেখলেও তা উপেক্ষা করেন।
বাংলাদেশ জার্নাল থেকে পাওয়া ‘রিস্ক পোটেনশিয়াল অব পাইপলাইন গ্যাস লিকস ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক গবেষণাটি পাইপলাইন গ্যাস নিয়ে হলেও গ্যাস বিস্ফোরণের ঝুঁকির জায়গা বোঝাতে সহায়ক। সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকায় ১২ হাজার কিলোমিটার গ্যাস লাইন রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৬ শতাধিক স্থানে লিক রয়েছে।
গবেষণায় দায়ী হিসেবে উঠে এসেছে, ব্যক্তি বা পরিবারের অসচেতনতা, লাইসেন্সধারী বিক্রেতাদের দায়িত্বহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির দুর্বলতা। গবেষকরা স্পষ্টভাবে বলছেন, এই ত্রিমাত্রিক অবহেলার কারণেই বারবার ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। সামগ্রিক প্রতিকারে তারা কিছু পরামর্শও দিয়েছেন। যেমন, বিএসটিআই কর্তৃক সিলিন্ডারের মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরো কঠোর করা, এলপিজি নিরাপত্তা সংক্রান্ত জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন, বাজারে অনুমোদিত কোম্পানির তালিকা গণমাধ্যমে প্রকাশ, স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস সেফটি হেল্পলাইন চালু এবং স্কুল-কলেজে নিরাপদ গ্যাস ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত সিলিন্ডার নয়, বরং তার যন্ত্রাংশ যেমন রেগুলেটর, হোস পাইপ, ভাল্ব ইত্যাদি থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশই নিম্নমানের এবং মান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাজারে পাওয়া যায়। এ ছাড়া সিলিন্ডার চুলার খুব কাছাকাছি রাখার প্রবণতা, ব্যবহার শেষে রেগুলেটর বন্ধ না করা এবং নিয়ম না মেনে রিফিল করা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ।
সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার তৃণমূল পর্যন্ত যেমন বাড়ছে, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনাও। বিস্ফোরণের ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা ভাববার সুযোগ নেই। বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলোর প্রতিকার জরুরি হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি উপেক্ষা না করে বিহিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়।