শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

সম্প্রীতির বন্ধনে রাবিতে সম্মিলিত ইফতার

সোহাগ আলী,রাবি ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৮ অপরাহ্ন শিক্ষা
সোহাগ আলী,রাবি ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৮ অপরাহ্ন
সম্প্রীতির বন্ধনে রাবিতে সম্মিলিত ইফতার

পবিত্র রমজান মাস এলেই পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের মনে ভেসে ওঠে ঘরের ইফতারের স্মৃতি। এই সময়ে পরিবার থেকে দূরে থাকলেও তাঁরা বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের নিয়ে গড়ে তোলে আরেকটি পরিবার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসজুড়েও সূর্যাস্তের আগে দেখা যায় এমন দৃশ্য। বিভাগ কিংবা অঞ্চলের ভেদাভেদ ভুলে শিক্ষার্থীরা দল বেধে ইফতার করেন। যেন পরিবার থেকে দূরে থেকেও বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতিই হয়ে উঠেছে তাদের নতুন ঠিকানা।


সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ; বিভিন্ন আবাসিক হলের বারান্দা, ছাদ কিংবা খেলার মাঠ সবখানেই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা ইফতারের প্লেট সাজিয়ে অপেক্ষা করছেন। শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই নন, অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও সমান উচ্ছ্বাসে অংশ নিচ্ছেন এই সম্মিলিত আয়োজনে। উপস্থিতির আনন্দে নেই কোনো ভেদাভেদ।


রমজান ঘিরে ক্যাম্পাসের আশপাশেও জমে ওঠে ইফতার কেনাবেচার ব্যস্ততা। আসর নামাজের পরই শুরু হয় পরিকল্পনা। কে কী আনবে, কীভাবে ভাগ হবে দায়িত্ব। এরপর শিক্ষার্থীদের ছুটতে দেখা যায় হলগুলোর সামনে থাকা দোকানে, ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিনোদপুর, স্টেশন বাজার, কাজলাসহ আশপাশের এলাকায়। ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপির সঙ্গে যুক্ত হয় কলা, আনারস, তরমুজ, বাঙ্গি, পেঁপেসহ নানা ফল। 


শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠে মুসলমান শিক্ষার্থীদের সাথে ইফতারে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হ্লাথইছা চাককে। তিনি রাবি’র ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ইফতারে অংশগ্রহণের বিষয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।


হ্লাথইছা চাক বলেন, আমি মুসলিম না, কিন্তু রোজা রাখতে ভালো লাগে। হোস্টেলে থাকাকালে বন্ধুদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে রোজা রাখতাম। এখনো রমজানে যতটা পারি রোজা রাখার চেষ্টা করি। বৌদ্ধ ধর্মেও উপবাসের প্রচলন আছে। তবে রমজানের ইফতারের সম্মিলিত পরিবেশ বিশেষ অনুভূতির। সবাই মিলে একসাথে ইফতার করার আনন্দটা আসলে বলে বোঝানো যায় না। বন্ধু আর সিনিয়র ভাইদের সঙ্গে বসে ইফতার করলে মনে হয় আমরা সবাই এক পরিবারের সদস্য।


রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা কয়েক বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি। কিন্তু এই অল্প সময়েই কিছু মুহূর্ত চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। তার মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো রমজানের দিনগুলো অন্যতম। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও বন্ধুরাই হয়ে ওঠে আরেকটি পরিবার। একসঙ্গে রোজা রাখা, ইফতারে পাশে বসা, কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া- সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত মায়া। রমজান শুধু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে না, আমাদের পারস্পরিক বন্ধনকেও আরও আন্তরিক করে তোলে।


আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসাইন বলেন, রমজান বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের জন্য ভালোবাসা, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। যেমন মুসলিমরা একে অপরের সঙ্গে ভালোবাসা বিনিময় করে, তেমনি অমুসলিম ভাইদের সঙ্গেও সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সাহরি ও ইফতারে তাদের অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভুলে এক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে। রমজান শুধু ইবাদতের মাস নয়। এটি মানবিক সম্পর্ক জোরদারেরও সময়।


এদিকে শিক্ষার্থীদের এই মিলনমেলাকে আরেকটু সুন্দর করতে এগিয়ে এসেছে রাবি শাখা ছাত্রদল। শিক্ষার্থীরা যাতে সুন্দরভাবে ইফতার আয়োজন করতে পারে সেজন্য শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু হেল্প ডেস্কের ব্যবস্থা করেছে। তিনি নিজ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার ও শেখ রাসেল মাঠে দুটি বুথ বসিয়েছে। যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা বসার জন্য পরিষ্কার প্লাস্টিক শিট, ফল কাটার জন্য ছুরি ও চপিং বোর্ড, ইফতার মাখানোর বড় ও ছোট গামলা, পানির বোতল ও বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করতে পারবে। 


হেল্প ডেস্কের আয়োজক ও শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, আমরা গতবছর রমজানেও এসব কাজ করেছি। এটা মূলত আমার মা ও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সাদকায় জারিয়া হিসেবে এটা করে থাকি। যাতে মানুষ উপকৃত হয়। আমরা প্রতি রমজানে এটি অব্যাহত রাখবো। গতবছরে পুরো মাসব্যাপী করেছি। এবারেও আমরা পুরো মাসব্যাপী এটা করবো যতদিন ক্যাম্পাস খোলা থাকে।