চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইদকে সামনে রেখে সীমান্তে বাড়ছে গরু চোরাচালান
আসন্ন ইদুল ফিতরকে সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় গরু চোরাচালান সিন্ডিকেট। এতে স্থানীয় খামারিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং দেশের প্রাণিসম্পদ খাতও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু গরু জব্দ করলেও প্রায় ২৫ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় নানা কৌশলে গবাদিপশু অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এর আওতাধীন প্রায় ২৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা কাঁটাতারবিহীন ও দুর্গম নদীপথ হওয়ায় এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে চোরাচালান চক্র। সীমান্তে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কিছু গরু জব্দ করা হলেও অধিকাংশ চালানই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলার পশুহাটে পৌঁছে যাচ্ছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার (২ মার্চ) সকালে পৃথক অভিযানে সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কালিনগর গ্রাম থেকে ৮টি এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখেরআলী বিওপির আওতাধীন চর এলাকা থেকে আরও ২টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়। জব্দ হওয়া ১০টি গরুর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২২ লাখ টাকা। পরে গরুগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুল্ক কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩৩টি গরু ও দুটি মহিষ জব্দ করেছে বিজিবি। এছাড়া গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে মোট ৭৯টি গরু ও ২৫টি মহিষ জব্দ করা হলেও আটক হয়েছে মাত্র কয়েকজন চোরাকারবারি। আটককৃতদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি নাগরিক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার জহুরপুর ও জহুরপুরটেক সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী গরু চোরাচালান সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। জহুরপুর ও জহুরপুরটেক এলাকার সাদেক, আবু, ইকবাল, মামুন, ডলার, মুকুল, কুতুবুল ও তৌহিদকে স্থানীয়রা এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে কলাগাছের ভেলা বা ছোট নৌকায় নদীপথে গরু সীমান্ত পার করে এনে পরে আমবাগান বা ফসলি জমিতে লুকিয়ে রেখে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল হোতারা আড়ালে থেকে সীমান্ত এলাকার দরিদ্র মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থের প্রলোভনে তারা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। অনেক সময় এসব মানুষ ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছেন, আবার হরহামেশাই প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
গত ২১ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সদর উপজেলার জহুরপুরটেক সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে গরু আনতে গিয়ে তিন বাংলাদেশিকে আটক করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর থানা পুলিশ। সূত্র মতে সিন্ডিকেটের মূল হোতা সাদেক ও কুতুবুলের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জনের একটি দল গরু আনতে ভারতে প্রবেশ করে। ভারতের রঘুনাথগঞ্জের মহালদারপাড়া-রামপুর এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ধাওয়া দিলে তিনজন আটক হন এবং বাকিরা পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
ভারত থেকে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ করায় দেশের প্রাণিসম্পদ খাত ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, সস্তা ভারতীয় গরুর কারণে দেশীয় গরুর ন্যায্যমূল্য মিলছে না, ফলে অনেক খামারি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তা (জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা) হলেন ডা. মো. গোলাম মোস্তফা জানান, কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই অবৈধভাবে গবাদিপশু দেশে প্রবেশ করায় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। বিশেষ করে খুরা রোগ ও লাম্পি স্কিন ডিজিজের মতো ভাইরাস দেশীয় গবাদিপশুর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এ বিয়য়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রায় ২৫ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা কাঁটাতারবিহীন ও দুর্গম নদীপথ হওয়ায় এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে চোরাচালান চক্র। সীমান্তে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কিছু গরু জব্দ করা হয়েছে এবং বিশেষ করে ইদুল ফিতরকে সামনে রেখে গরু চোরাচালান ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।