চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্ট্রবেরির বাম্পার ফলন, ৭৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছর নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে উন্মোচিত হয়েছে স্ট্রবেরি চাষে। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের চারা ও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় চলতি মৌসুমে জেলায় স্ট্রবেরির বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ১১৫ হেক্টর জমিতে চাষ হওয়া স্ট্রবেরি থেকে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিদের উদ্বেগ কাটছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জেলায় প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছিল। পরের বছর কিছুটা কমে তা দাঁড়ায় ৮২ হেক্টরে। তবে চলতি মৌসুমে আবারও আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ হেক্টরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে শিবগঞ্জ উপজেলায়।
কৃষি বিভাগ বলছে, প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ১৩ টন করে স্ট্রবেরি উৎপাদন হচ্ছে। সেই হিসাবে জেলায় মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৯৫ টন। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি গড়ে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এই দাম স্থিতিশীল থাকলে মৌসুম শেষে প্রায় ৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার কালুপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক সেলিম বলেন, মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি প্রায় তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এখন বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। তবু ফলন ভালো হওয়ায় আমরা খুশি।
মাঠে বাম্পার ফলন হলেও কৃষকরা প্রত্যাশিত লাভ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের কারণে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে মানভেদে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনে খুচরা বাজারে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীসহ বড় শহরের সুপারশপগুলোতে একই স্ট্রবেরি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
স্ট্রবেরি চাষি আব্দুল মালেক বলেন, এই ফল বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। হিমায়িত সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বাধ্য হয়েই কম দামে বিক্রি করতে হয়।
পরিবহণ ব্যয়ও চাষিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ কেজি স্ট্রবেরির একটি কার্টুন ঢাকা বা দূরের জেলায় পাঠাতে প্রায় ৬০ টাকা খরচ হয়। প্রতিদিন একজন চাষি গড়ে ১০০ থেকে ১৩০ কেজি পর্যন্ত স্ট্রবেরি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠান। ফলে পরিবহণ ব্যয় কৃষকদের লাভের বড় অংশ কমিয়ে দিচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী বলেন, এবার স্ট্রবেরির আবাদ ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১৩ টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম জানান, কৃষকরা আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানালে দ্রুত পরিবহণ ও বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।
উল্লেখ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্ট্রবেরি চাষ ইতোমধ্যে লাভজনক বিকল্প ফসল হিসেবে সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এই খাত ভবিষ্যতে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।