বরেন্দ্রে খরায় কমছে ফলন, বাড়ছে পানির সংকট
টেকসই সমাধান দরকার
বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে খরা। আর এই খরার কারণে কমছে জমির ফলন। এতে চাষের জন্য কৃষকের ব্যয়ও বেড়েছে। সেইসাথে বাড়ছে পানি সংকটও। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যে হারে নিচে নামছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং এক ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের অশনিসংকেত। দুঃখজনক হচ্ছে, গত এক দশকে একাধিক সরকার এখানে নানা পদক্ষেপ নিলেও তার সুফল মিলছে না।
গেল ৬ মার্চ ‘এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ইন্ডিকেটরস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং ফসল হ্রাসকে সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষকদের স্বল্পমেয়াদি কৌশল অবলম্বনে বাধ্য করছে এবং যা দীর্ঘমেয়াদি কৃষি টেকসইতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, খরার কারণে কিছু এলাকায় ধানের উৎপাদন প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং গমের উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কৃষকদের মতে, বাস্তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। তানোরে প্রতি বিঘায় ধানের ফলন ২২-২৪ মণ থেকে কমে ১৪-১৬ মণে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, কিছু এলাকায় গমের উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সংকটের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। ধান চাষের জন্য গভীর নলকূপের লাগামহীন ব্যবহার এবং অনিয়মিত বৃষ্টির ফলে প্রকৃতি আর পানি পুনর্ভরণ (রিচার্জ) করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে মাটির নিচ থেকে পানি তোলার এই প্রতিযোগিতা একদিন মাটিকে মরুভূমি বানিয়ে ছাড়বে। আজ সেই আশঙ্কাই সত্যি হচ্ছে। হাতে চাপা নলকূপে পানি উঠছে না, পুকুর-খাল শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, এমনকি সুপেয় পানির অভাবে সামাজিক সম্পর্ক বা বিয়ের মতো পারিবারিক বন্ধনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এর কঠোর বাস্তবায়ন। শুধু বিধিনিষেধ আরোপ করলেই হবে না, কৃষকদের বিকল্প কম পানিনির্ভর ফসল (যেমন ডাল বা তেলবীজ) চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নদীনালার নাব্যতা ফিরিয়ে এনে উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আমরা আশা করি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে। বরেন্দ্রর তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার বন্ধ করতে হলে কেবল প্রজ্ঞাপন নয়, চাই দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধান। মনে রাখতে হবে, পানি ছাড়া জীবন ও প্রকৃতি-উভয়ই অচল। এই সংকট মোকাবিলায় দেরি করার অর্থ হলো একটি বিশাল জনপদকে স্থায়ী বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া।