বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬

দুর্গাপুরে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে লাঞ্ছনা, বিএনপি নেতা বহিষ্কার

দুর্গাপুর প্রতিনিধি ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দুর্গাপুর প্রতিনিধি ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন
দুর্গাপুরে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে লাঞ্ছনা, বিএনপি নেতা বহিষ্কার

দুর্গাপুরে দাউকান্দি সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে (প্রদর্শক) মারধর ও কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলাকারীরা নারী প্রদর্শককে মারধর করে চুল ধরে বাইরে টেনে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হামলাকারীরা কলেজ প্রাঙ্গণে ঢুকে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।


অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা এই হামলার সঙ্গে জড়িত। কলেজের নারী প্রদর্শক আলিয়া খাতুনকে (হীরা) স্যান্ডেল দিয়ে পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।


হামলায় আহত অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর প্রদর্শক আলিয়া খাতুন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।


প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় একজন মৎস্য ব্যবসায়ী বিএনপির কর্মী শাহাদত আলী প্রদর্শক আলিয়া খাতুনকে স্যান্ডেল দিয়ে পিটিয়েছেন। শাহাদত আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহবুর কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রদর্শক আলিয়া খাতুনের ওপর হামলা চালান। হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জয়নগর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এজদার, জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ব্যবসায়ী আফাজ উদ্দিন প্রমুখ।


কলেজটি দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নে অবস্থিত। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ওই কলেজে স্নাতক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এদিন বেলা দুইটা থেকে মার্কেটিং ও ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ের পরীক্ষা ছিল।


কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় তাফসির মাহফিলের আয়োজন উপলক্ষে সাবেক পুলিশ সদস্য আবদুস সামাদের নেতৃত্বে কয়েকজন বিএনপি নেতা কলেজে আসেন। তারা অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার সময় আলিয়া খাতুন ভিডিও করছিলেন। জয়নগর ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন প্রদর্শক আলিয়া খাতুনের মুঠোফোন কেড়ে নিতে বলেন। আফাজ উদ্দিন তার মুঠোফোন কেড়ে নিতে যান। তখন আলিয়া তাকে থাপ্পড় মারেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কি হয়। মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার পর আলিয়া খাতুন নিচে এসে আফাজ উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন।


এদিকে একই সময়ে কলেজের পুকুরের ইজারাদার মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপির কর্মী শাহাদাত আলী অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। তার বিরুদ্ধে কলেজের পুকুর ইজারা নিয়ে টাকা না দেওয়ার অভিযোগ আছে। শাহাদত আলীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে শাহাদত আলীকে থাপ্পড় মারেন আলিয়া খাতুন। তখন শাহাদত আলী পা থেকে স্যান্ডেল খুলে আলিয়া খাতুনকে পেটাতে থাকেন। এই খবর পেয়ে শাহাদত আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহাবুর গিয়ে অধ্যক্ষ এবং আলিয়ার ওপরে হামলা চালান।


কলেজের শিক্ষকেরা জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ আসে। পুলিশ সবাইকে বের করে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। বেলা পৌনে একটার দিকে কলেজ থেকে সবাই বেরিয়ে যান। বেলা দুইটায় পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা শুরুর পরে বিএনপির ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী কলেজের ভেতরে ঢোকেন। তারা কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ঢুকে অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক ও আলিয়া বেগমকে ব্যাপক মারধর করেন। কলেজে কার্যালয় ভাঙচুর করেন। অধ্যক্ষের কক্ষে সাজানো ক্রেস্টসহ অন্যান্য উপহারসামগ্রী ভেঙে ফেলেন। এরপর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।


এ ব্যাপারে শাহাদত আলী বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে তার টাকাপয়সা পরিশোধ আছে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সব এলোমেলো থাকার কারণে টাকা দেওয়া হয়নি। তিনি ওই টাকার হিসাব-নিকাশ করার জন্যই কলেজে এসেছিলেন। তার আগেই তাফসির মাহফিলের চিঠি দিতে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে প্রদর্শক আলিয়া খাতুন দুর্ব্যবহার করেছেন এবং একজনকে চড়ও দিয়েছেন। এই পরিস্থিতি মধ্যে তিনি অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে বলেন যে ‘এই পরিস্থিতির মধ্যে কথা বলার পরিবেশ নাই । আমি না হয় পরের একদিন আসি।’


শাহাদত আলী বলেন, অধ্যক্ষ মহোদয় বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিলেন কিন্তু পাশ থেকে আলিয়া বলে ওঠেন, ‘তুই ওদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস, তুই কিসের বিএনপি নেতা?’


শাহাদত আলী দাবি করেন, এ কথা বলার পরই আলিয়া তার গালে একটা থাপ্পড় মারেন। তখন তিনি পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাঁকে মেরেছেন। এরপর চলে এসেছেন।


অপর পক্ষে আলিয়ার দাবি হচ্ছে, হামলাকারীরা অধ্যক্ষের ওপরে হামলা চালাচ্ছিল, অধ্যক্ষ স্যারের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি ভিডিও করছিলেন। তারা ভিডিও করতে দেবে না, এ জন্য তার ওপরে হামলা করে তাকে স্যান্ডেল দিয়ে মারপিট করে এবং তার মুঠোফোনটা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে। তিনি আর ফোন পাচ্ছেন না। আর অধ্যক্ষ স্যারের মুঠোফোনটি হামলাকারীরা ভেঙে পুড়িয়ে দিয়েছে।


এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলার জন্য বারবার চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। কলেজের অন্য শিক্ষকেরাও তার বাসার ঠিকানা বলতে পারেননি।


দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি ) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কোনো পক্ষ অভিযোগ করেনি। তবে অভিযোগ পেলে পরবর্তীতে আইনানুক অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।


এদিকে এই ঘটনায় দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে  বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়।


বহিষ্কৃত বিএনপির নেতার বিরুদ্ধে কলেজের অফিস কক্ষ ভাঙচুর, অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের ওপর হামলা এবং নারী প্রভাষককে প্রকাশ্যে স্যান্ডেল দিয়ে পেটানো অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে লিপ্ত থাকার সুষ্পষ্ট অভিযোগে দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো।


এই বিষয়ে কথা বলার জন্য আকবর আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক বিশ্বনাথ সরকারকে কল দিলেও তারা ধরেননি।


তবে এর আগে দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান আয়নাল বহিষ্কারের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। তিনি বলেন কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করলে কিছুই করার নেই। তবে আমরা স্থানীয়ভাবে মিমাংসা করার চেষ্টা করছি।