নওগাঁয় ছোট যমুনায় অবৈধ বালু উত্তোলন, হুমকিতে দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও ফসলি জমি
নওগাঁর বদলগাছী উপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদী। নদীর বুকে বালু নেই। উত্তরাঞ্চরে নদীর গতিপথ বন্ধ থাকায় ছোট যমুনা নদীতে আর বালু আসে না। জেলা মাটি ও বালু মহাল লীজ প্রদান কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক কয়েক বছর থেকে ছোট যমুনা নদীর লীজ প্রদান বন্ধ আছে। তবু নদীর বালু শূন্য বুক যেন বালুখেকোদের করাল গ্রাসে।
বদলগাছীর নালুকাবাড়ী ও মানপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন নদীর বুক চিরে দিনের আলোয়, আবার রাতের অন্ধকারে নির্বিঘ্নে চলছে অবৈধ বালু লুট। প্রভাবশালী চক্রের লাগামহীন এই তান্ডবে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং শতাধিক পরিবারের স্বপ্ন।
তথ্য সংগ্রহকালে দেখা যায়, ছোট যমুনা নদীর নালুকাবাড়ী ও মানপুর আশ্রয়ন প্রকল্পের দুই পয়েন্টে যেন বসেছে বালুর কালোবাজার। ট্রাক্টরের অবিরাম যাতায়াত আর নদীর পাড়জুড়ে বালুর বিশাল স্তুপ,সব মিলিয়ে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে অবৈধ বাণিজ্যের অভয়ারণ্যে। ইজারা নেই, অনুমতি নেই, তবুও প্রকাশ্যে চলছে বালু বিক্রি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এর নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়া।
দীর্ঘ দেড় বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় এই লুটপাট চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে আগামী বর্ষা মৌসুমে নদীর তীর ভেঙে ক্রমেই এগিয়ে আসছে বিপদ। ইতোমধ্যে নালুকাবাড়ী ও মানপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয় মুকুল নামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,"আমরা গরিব মানুষ। সরকার মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছে। এখন বালুখেকোদের কারণে সেই ঘরটুকুও হারানোর ভয় করছে।"
শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্পই নয়, হুমকির মুখে পড়েছে নদীর তিরবর্তী বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। প্রতিদিন বিলীন হচ্ছে ফসলি জমির অংশ। কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হচ্ছে।
স্থানীয় একজন কৃষক হানিফ বলেন,“মিজান, দেলোয়ার,সুমন, হিরো নামে কয়েকজন ইসবপুর ওয়াড ও ইউনিয়ন বিএনপি নেতারা গত দেড় বছর থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিক্রি করছে। আমি বাঁধা দিয়েছিলাম,আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। পরে আমি সহ কয়েকজন ফসল রক্ষার জন্য কিছু জায়গা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছি। সরকার ইজারা দেয় নি। তারা ক্ষমতার জোড়ে এসব করছে। বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
ঘটনাস্থলে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে ট্রাক্টর ফেলে পালানোর চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। পরে এক শ্রমিকের সাথে কথা হলে স্বীকার করেন, কোনো ইজারা ছাড়াই এখানে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতি ট্রাক্টর বালু বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন দেলোয়ার নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই চলছে এই অবৈধ বালু সাম্রাজ্য। প্রতিবাদ করলেই হুমকি-ধমকির মুখে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান ছনি বলেন,“ অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে বেশ কয়েকদিন অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অভিযানের খবর পেয়ে কেউ ঘটনাস্থলে থাকে না। তবে কিছু জায়গায় বালুর স্তুপ রয়েছে,সেগুলো জব্দ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথি জানিয়েছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। আপনি লোকেশন দিন,প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছ।”
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন "ব্যবস্থা কোথায়? অভিযান কোথায়? তাদের দাবি, গত দেড় বছরে ছোট যমুনার এই দুই পয়েন্ট থেকে কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে আর সাধারণ মানুষ হারাচ্ছেন জমি, ফসল ও নিরাপদ আশ্রয়। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে, ছোট যমুনার নালুকাবাড়ী ও মানপুর পাড়ে গড়ে ওঠা আশ্রয়ণ প্রকল্প দুটি খুব শিগগিরই মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে। আর তখন দায় নেবে কে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নদীপাড়ের মানুষের মনে।