বর্ষায় ডাকাত আতঙ্কে নিরাপত্তাহীন বাথান মালিকেরা!
যমুনার বিস্তীর্ণ চরগুলোর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজ ঘাসের সমারোহ। আর এ ঘাসের ওপর শত শত মহিষের অবাধ বিচরণ আর রাখালদের ব্যস্ততা। গ্রীস্মকাল শেষে বর্ষা আসছে। এ সময় চরাঞ্চলে ডাকাতদের আনাগোনা অনেকটাই বেশি হয়। ডাকাত আতঙ্কে নিজেদের রক্ষায় নিরাপত্তা চান উপজেলার মহিষের বাথানের মালিকেরা। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ১২ ইউনিয়নের মধ্যে চারটি ইউনিয়নের সম্পূর্ণসহ ৮ টি ইউনিয়ন যমুনা নদীর গর্ভে অবস্থিত। ফলে এ উপজেলায় বিশালাকার চরাভূমি রয়েছে। যেখানে প্রতিবছর বিস্তীর্ণ এলাকায় গো চারণভূমির সৃষ্টি হয়।
এই গো চারণভূমিতে আদিকাল থেকেই মহিষ পালন হয়। চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস থাকায় মহিষ পালন করতে বাড়তি কোনও খরচের প্রয়োজন হয় না। কয়েকজন খামারি চর এলাকায় একত্রে মহিষ পালন করেন। কয়েকজন খামারির একত্রে একটি বাথান তৈরি হয়। প্রতিটি বাথানে ১০০ থেকে ২০০ বা তার চেয়ে বেশি মহিষ থাকে। প্রতিটি বাথান দেখাশোনার জন্য এক বা একাধিক রাখাল থাকে। রাখালরা সকালে মহিষের দুধ দোহন করে তা বাজারজাত করতে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। পরে মহিষগুলো দলবেঁধে নিয়ে যান চারণভূমিতে।
এসব চারণভূমি বাথানের মালিকরা জমির মালিকদের নিকট থেকে বেশ উচ্চমূল্যে ক্রয় করেন। রাখালরা দুপুরে মহিষগুলোকে যমুনা নদীতে গোসল করান। এরপর আবারো চারণভূমিতে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে মহিষগুলোকে পুনরায় চরের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। এরপর রাতে আবারও দুধ দোহন করা হয়। এর মাঝেই রাখালরা মহিষকে ধানের কুঁড়া এবং ভূষি মিশ্রিত পানি খেতে দেন। রাতে রাখালরা মহিষকে পাহারা দেয়ার জন্য মহিষের সাথেই রাত যাপন করেন।
মহিষের সাথে রাতযাপন করাই রাখালদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ গত কয়েকবছর খামারে ডাকাত পড়েছে। কখনো ডাকাতরা রাখালদের তুলে নিয়ে গিয়ে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। কখনো বা হাত পা বেঁধে মারপিট করে রাখালদের মারাত্মক আহত করে চলে গেছে। বাথান থেকে নিয়ে গেছে গরু/ মহিষ। এ কাজ সাধারণত বর্ষার মৌসুমেই হয়ে থাকে। তাই আগামী বর্ষার মৌসুমে ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পুলিশী নিরাপত্তা চান মহিষের বাথান মালিকসহ রাখালরা।
খামারিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার কাজলা ইউনিয়নের আমরুলের বাথানে ৪ জন খামারির ১০৬ টি মহিষ, একই ইউনিয়নের লিটন মিয়ার বাথানে ৫ জন খামারির ১৮০ টি মহিষ, হাটশেরপুর ইউনিয়নের আমরুলের ৬ জনের ১৬০ টি মহিষ, হাটশেরপুর ইউনিয়নের শাহজাহানের বাথানে ১৫০ টি মহিষসহ পুরো উপজেলায় প্রায় ১০টির বেশি বাথান রয়েছে। ছোট-বড় সবমিলিয়ে মহিষের সংখায় রয়েছে অন্তত সহস্রাধিক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক যুগ ধরেই চরাঞ্চলে মহিষ পালন হয়ে আসছে। আগে এটি ছিল পারিবারিক পর্যায়ের। এখন তা বড় আকারের খামারভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে। কয়েকজন খামারি মিলে একটি বাথান গড়ে তোলেন। কোথাও ৮০টি, কোথাও ১৫০ থেকে ২০০টিরও বেশি মহিষ থাকে। এসব মহিষ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দুধ উৎপাদিত হয়। স্থানীয় বাজার ছাড়াও নৌপথে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যায় সেই দুধ।
সাধারণত একটি বাথান থেকে অপর বাথানের দূরত্ব বেশ কয়েক কিলোমিটার হয়ে থাকে। তাছাড়া চরে এক বাথান থেকে অপর বাথানে নৌকা বা পায়ে হেঁটে চলাচল করার কোনও বিকল্প ব্যবস্থা নাই। তাই খামারিরা একজোট হয়েও ডাকাতদের বিরুদ্ধে শক্ত কোনও প্রতিরোধও গড়ে তুলতে সাহস পান না। তাই তারা ডাকাত থেকে বাঁচতে প্রশাসনের সার্বিক সহায়তা একান্তভাবে কামনা করেছেন।
মহিষের খামারি তোতা মিয়া জানান, সবকিছুর দাম বেশি হওয়ায় এবং উচ্চ মূল্যে চারণভূমি কিনতে তাদের মহিষ পালন করতে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। তার উপরে আসছে বর্ষাকালে ডাকাতের ভয়। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমাদের কোনও চাওয়া পাওয়া নেই। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, তারা যেনো বর্ষাকালে ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদান করেন।
সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. এ জেড এম খালেদ জুলফিকার জানান, উপজেলায় প্রায় ১০০ খামারির ৮৫০ টি মহিষ রয়েছে। মহিষদের ব্রিডিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন এ আই টেকনিশিয়ান নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া মহিষের জন্য বিনামূল্যে কৃমিনাশক ওষুধ সরবরাহও চালু রয়েছে। তিনি বলেন, ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেতে খামারিরা যদি আমাদের অভিযোগ জানান, তাহলে তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হবে।
ওই এলাকার খামারি মোস্তফা, আজাহার আলীসহ অনেকেই বলছেন, চরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত নৌ টহল জোরদার করাসহ রাতের বেলায় নদীপথে পুলিশের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম চরাঞ্চলে মৌসুমি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা প্রয়োজন। এছাড়াও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। কারণ চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনিয়মিত থাকায় বিপদের সময় পুলিশ বা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা বা দ্রুত সংকেত দেওয়ার কার্যকর মাধ্যম থাকা দরকার। এতে অন্তত জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে।
সারিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আ ফ ম আসাদুজ্জামান বলেন, ইতিপূর্বে এ উপজেলায় চুরি বা ডাকাতির মতো বেশকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তাই বর্ষাকালে খামারিদের মধ্যে এ বিষয়ে আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে বাথানের মালিকদের সাথে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। যাতে কোনও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে তারা দ্রুত আমাদের বিষয়টি অবগত করেন এবং আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। এ ছাড়াও নৌ পুলিশকে সর্বোচ্চ টহল ব্যবস্থা জোরদার করতে পরামর্শ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি বর্ষাকালে আমাদের থানা পুলিশের নৌকায় টহল ব্যবস্থাও থাকবে।