মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য, গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৯ মে ২০২৬ ১১:৪০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৯ মে ২০২৬ ১১:৪০ অপরাহ্ন
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য, গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা

বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির কার্যালয়ে গেল এপ্রিল মাসের ২৮ তারিখে যান জমি বিক্রেতা শাহনাজ বেগম এবং গ্রহীতা ময়েন উদ্দিন। দলিল লেখা শেষে রেজিস্ট্রির খরচ জানতে চাইলে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ২.৪৮ শতক। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে দলিল লেখক ও গ্রহীতার মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।


একপর্যায়ে গ্রহীতার স্বজনরা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সমিতির নামে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। পরে অন্যান্য জমির ক্রেতা-গ্রহীতারাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। তারা অভিযোগ করেন, একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সমিতির নাম ব্যবহার করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে।


শুধু বাগমারা নয় রাজশাহীর ১০টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এমন অতিরিক্ত ফি নেওয়া হচ্ছে। বাগমারা উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মেলে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিও। শুধু তাই নয়, বাড়তি টাকা আদায় করা হয় ক্রেতা-বিক্রেতার টিপসই নিয়েও। জেলায় ১০টি সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মাসে গড়ে সাড়ে তিন হাজার দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। এখান থেকে সরকার প্রায় ১২ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। 


রাজশাহীতে সপ্তাহে দুদিন বা তিনদিন চলে জমি রেজিস্ট্রি কার্যক্রম। দলিলের নানা ভুল ত্রুটির কথা বলে দিনের পর দিন চলে হয়রানি। অভিযোগ আছে, দলিল লেখক সমিতির নেতারা মৌজা প্রতি সরকার নির্ধারিত ফির চেয়েও অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রি করেন- যার ভাগ পান সাব রেজিস্টাররাও। রাজশাহীর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। 


গোদাগাড়ী সাব রেজিস্টার অফিসের সহকারি আমিনুল ইসলাম। অকপটে ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, জমি রেজিস্ট্রির পর ক্রেতা বিক্রেতাদের টিপসই নেয়া হয়। এই টিপসই দিতেও নেয়া হয় টাকা।


নকিবুর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমার খতিয়ান ছিল না। তারা বলল আপনি খতিয়ান তুলে নিয়ে আসেন। তবে তারা বলেন, আপনি টাকা পয়সা আমাদের দিলে হয়রানি হতে হবে না। আরেক ভুক্তভোগী জমির উদ্দিন বলেন, দলিল লেখকদের টাকা না দিলে কাজ পেন্ডিং রাখে। টাকা না দিলে কোন কাজও করতে চায় না। পরে আসেন বলে ঘোরাতে থাকে।


অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয় অস্বীকার করেন দলিল লেখক সমিতির নেতারা। পবা দলিল লেখক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান সবুজ বলেন, আমার এ সমিতি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। কোন পাবলিকের কাছে বা দাতাগ্রহীতার কাছে কোন অর্থ দাবি করা হয় না। তবে, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন অন্য দলিল লেখকরা। তানোরের দলিল লেখক গোলাম রাব্বানী বলেন, সরকারি রেটের চাইতে আমরা ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি নিচ্ছি। বড় দলিল পেলে টাকা আরও বেশি নিতে হয়। 


এত কিছুর পরও সাব রেজিস্টাররা বলছেন, অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ পেলে তবেই ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া সম্ভব। চারঘাট উপজেলার সাব রেজিস্টার খালেদা সুলতানা বলেন, দালাল নিয়ন্ত্রণ আমাদের দায়িত্ব না। আমার আশপাশে কেউ দালালের খপ্পরে যদি পড়ে আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে- সেইটুকু দেখতে পারব। 


বাগমারা ও বাঘা উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা সাব রেজিস্ট্রার  এন এ এম নকিবুল আলম বলেন, দলিল লেখকদের তালিকা একটা ছিল। যেখানে ছবি ছিল না। আমরা একদম ছবিসহ এবার একটা তালিকা করে দেব যেন কেউ দালালদের না কাছে না যায়। 


ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, সাব রেজিস্টারদের কাজ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সাবরেজিস্টাররা ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় না। সে কারণেই অনিয়মের সুযোগটা তারা পাচ্ছে। এটা যেন বন্ধ হয় তার জন্য আমি এর আগেও বলেছি যে, একটি ছাতার নিচে তিনটি মন্ত্রালয়কে নিয়ে এসে ব্যবস্থা নেওয়ার।