কৃষিবিদ শামীমের অনন্য উদ্যোগ, ২০০ লিচু গাছ ফ্রি সবার জন্য
জৈষ্ঠ্যমাসের রসালো ফল লিচু। থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল টসটসে লিচু। ভাবুন তো এমন একটি লিচু বাগানে গেলে কেমন লাগবে আপনার। নিশ্চয়ই লিচুর দিকে হাত না বাড়িয়ে পারবেন না। আবার ধরুন, এমন একটি লিচু বাগান পেলেন, যেখানে নিজের ইচ্ছা আর পছন্দ মতো নিজ হাতে লিচু পেড়ে খাচ্ছেন। কিন্তু তার জন্য আপনাকে একটি টাকাও দিতে হবে না !
কি আশ্চর্য হলেন তাই তো। ঠিকই শুনছেনে। অবিশ্বাস্য হলেও, এটাই সত্যি। পাবনায় এমনই একটি লিচু বাগান রয়েছে, যেখানে যে যার ইচ্ছামতো লিচু পেড়ে খেতে পারবেন আবার বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারবেন। তার জন্য কোনো টাকাও দিতে হবে না।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আলোকদিয়ার গ্রামের কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম গড়ে তুলেছেন এমনই এক ব্যতিক্রমী লিচু বাগান। তার ৮ বিঘার জমির উপর ২০০ এর অধিক লিচু গাছে রয়েছে নানা জাতের লিচু। শুধু মানুষই নয়, এই বাগানের লিচু পশু-পাখির জন্যও উন্মুক্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে এই লিচু বাগান।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এলাকাবাসী, হতদরিদ্র, দর্শণার্থী ও বন্ধু-স্বজনদের কথা চিন্তা করে এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছেন বাগান মালিক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও পাবনা শহরের অন্যতম স্বাস্থসেবা প্রতিষ্ঠান কিমিয়া সেন্টারের স্বত্তাধিকারী কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম। যিনি চিকিৎসা সেবা, শিক্ষাবৃত্তি, মেধাবৃত্তি, বৃক্ষরোপণ, কিডনী ও হার্টের চিকিৎসা সেবা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি এক নামে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি শহরের প্রাণ কেন্দ্র আব্দুল হামিদ সড়কে পাবনা কলেজ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি বিষয়ে শিক্ষকতাও করছেন।
প্রায় দেড় যুগ আগে তিনি পৈত্রিক ও নিজস্ব অর্থে কেনা জমিতে এই লিচুর বাগান করেন। লিচু বাগানের ২০০ এর অধিক গাছে থোকায় থোকায় নানা জাতের লিচুতে পরিপূর্ণতা পায় লিচু বাগান। খাবার উপযোগী হলেই স্থানীয় গ্রামবাসী, আশপাশের লোকজন, দরিদ্র, হতদরিদ্র, বন্ধু-বান্ধব স্বজনেরা এসে ইচ্ছেমতো বিনা পয়সায় এই লিচু খেতে পারেন। নিজ হাতে লিচু ভেঙ্গে খাওয়া এ যেন এক বিনোদনের আয়োজন। এই বাগানের লিচু কোনদিন বিক্রি করা হয়নি। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি যেন এই লিচু খেতে পারে এ জন্য বাগান করা হয়েছে উন্মুক্ত। নেই কোন বাউন্ডারি ওয়াল, সীমানা প্রাচীর বা কাটা তারের বেড়া। খাচা বা নেট ব্যবহার একেবারেই নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের একপাশে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদী। নদীর পাড়ের বিপরীতের খোলা মাঠ। নানা ফসলের সমারোহের মাঝেই এই লিচুর বাগান গড়ে তুলেছেন কৃষিবিদ শামীম। সারিবদ্ধ গাছগুলো টসটসে লিচুতে ছেয়ে গেছে। নানা শ্রেণি পেশার নারী পুরুষ ও শিশুরা আসছেন বিনা পয়সার বাগানে লিচু খেতে। ইচ্ছেমতো লিচু খেয়ে পরিবারের জন্য নিয়েও যাচ্ছেন অনেকে। এ যেন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই কৃষি উদ্যোক্তা।
বাগান দেখতে আসা কলেজ শিক্ষক আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, সম্প্রতি ফেসবুকে বিষয়টি দেখতে পাই। তারপরই ছুটে এসেছি স্বচক্ষে এমন উদ্যোগ দেখার জন্য। আমি দেখে মুগ্ধ। আসলে মানুষের জন্য কিছু করার সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। যার জলন্ত উদাহরণ কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা জামাল শামীম।
আরেক দর্শণার্থী পাভেল মৃধা বলেন, মানুষ ইচ্ছে করলেই মানবিক, উদার আর জনবান্ধব হতে পারেন। বর্তমানে কেউ কাউকে ছাড় দেন না। সেখানে বাণিজ্যিক যুগে এসে নিজ খরচে ২০০ গাছের লিচু বিনা পয়সায় খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করা কম কথা নয়। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, সাধুবাদ জানাই।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রাজু আহমেদ জানান, ভালো কাজ করে গ্রামকে সবার কাছে আলোচিত করতে একজনই যথেষ্ট। যার উদাহরণ আমাদের গ্রামের কৃতি সন্তান শামীম। তার এই মহতি উদ্যোগের কারণে গ্রামের অনেক মানুষকে বাজার থেকে লিচু কিনে খেতে হয় না। যাদের লিচু খাওয়ার ইচ্ছে হয় তারা যে কোন সময়ে লিচু খেতে বাগানে চলে আসেন। বাগানে আসতে কোন দরজা পেরুতে হয় না। কারও অনুমতিও লাগে না।
আলাপকালে লিচু বাগানের মালিক, কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম বলেন, রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না এই লিচু আবাদে। বাগানে দেয়া হয় না কোন নেট বা বন্ধনী। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এই লিচু বাগান। গ্রামের মানুষের পাশাপাশি ছোট্ট বাচ্চাদের খুশি করতেই এই উদ্যোগ। যেন বাচ্চারা আনন্দের সাথে নিজে হাতে লিচু পেড়ে খেতে পারে। আমি সব সময় বাগানে বা গ্রামে থাকিনা। কিন্তু যখন শুনি বাগানে নানা শ্রেণির মানুষ দল বেধে এসে লিচু ভেঙ্গে খাচ্ছেন শুনেই তৃপ্তি পাই, ভালো লাগে।
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এমন উদ্যোগ সচরাচর কোথাও দেখা যায় না। স্বাগত জানাই বাগান মালিককে এমন একটি ভাল কাজ করার জন্য। অনেক দরিদ্র মানুষ আছে, যাদের ইচ্ছে থাকলেও কেনার সামর্থ্য না থাকায় লিচু খাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। তাই দেশের আরও যারা লিচু বাগান মালিক আছেন, তারা যদি এমন উদারতা দেখান তাহলে সমাজের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবেন।