ত্যাগের ইদ শেষে উৎসবের আমেজ
পবিত্র ইদুল আজহা পালিত হয়েছে গেল বৃহস্পতিবার। কিন্তু শুক্রবার (২৯ মে) থেকে শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ ত্যাগের মহিমায় যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, তা রূপ নিয়েছে অনাবিল আনন্দের এক সামাজিক মেলবন্ধনে। নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি আর ব্যস্ততার চাদর মুড়িয়ে বরেন্দ্রভূমির মানুষ এখন জীবনের একটু সহজ সমীকরণ খুঁজছে। আর সেই খোঁজে শুক্রবার থেকে রাজশাহীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নেমেছে মানুষের ঢল।
ইদের দিন কোরবানি আর অতিথি আপ্যায়নের চেনা ব্যস্ততা সামলে, পরের দিনগুলো থেকে মানুষ তুলে রেখেছে নিজের ও পরিবারের একান্ত আনন্দের জন্য। বিকেলে যখন সূর্যের আলো নরম হয়ে আসে, তখন পদ্মার বুক ছুঁয়ে আসা বাতাস যেন এক জাদুকরি টানে টেনে আনে হাজারো প্রাণকে। সৌন্দর্যের চাদরে মোড়ানো পদ্মার টি-বাঁধ, আই-বাঁধ আর বড়কুঠি ছিল লোকারণ্য।
টি-বাঁধের ব্লকে বসে পদ্মা দিকে তাকিয়ে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আমজাদ হোসেন। সঙ্গে তার পুরো পরিবার। তিনি বলেন, কোরবানি আমাদের ত্যাগ শেখায়, আর এই নদী আমাদের শেখায় উদারতা। কোরবানির ইদে মাংস কাটা আর বিতরণের ধকল সামলাতেই প্রথম দিনটা কেটে যায়। একটু সময় পেয়ে পরিবারকে নিয়ে নদীর পাড়ে এলাম। পদ্মার এই বাতাস যেন সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়। ইদের আসল আনন্দ তো এই আপনজনদের মুখের হাসিতেই।
বড়কুঠিতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন একদল তরুণ-তরুণী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইসা আনজুম (২৫) বলেন, জীবনের যান্ত্রিকতায় আমরা বড্ড হাঁপিয়ে উঠি। আমাদের কাছে ইদ মানেই পদ্মার পাড়। বাইরে থেকে কেউ ঘুরতে আসলে সবার আগে নদী ঘুরে দেখানোর কথা মাথায় আসে। এখানে এলে মনে হয় সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেল। এছাড়া বন্ধুদের সাথে আড্ডা, রাস্তা ঘুরা আর ফুচকা খাওয়া ছাড়া আমাদের রাজশাহী শহরের ইদ যেন পূর্ণতাই পায় না।
পদ্মাপাড়ের স্নিগ্ধতার পাশাপাশি উৎসবের অন্য রকম এক জোয়ার দেখা গেছে পদ্মা আবাসিকে অবস্থিত আরডিএ পার্ক এবং শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায়। বিশেষ করে শিশুদের কোলাহলে মুখরিত ছিল এই চত্বরগুলো। রাইডগুলোতে চড়ার জন্য শিশুদের দীর্ঘ লাইন আর অভিভাবকদের চোখেমুখে ছিল এক প্রশান্তির ছোঁয়া।
বানরের খাঁচার সামনে শিশুদের কৌতূহলী চোখ যেন এক অপার আনন্দের গল্প বলছিল। চারঘাট থেকে আসা দিনমজুর শফিকুল ইসলাম তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছেন চিড়িয়াখানায়। তিনি বলেন, সারা বছর অভাবের সাথে যুদ্ধ করতে হয়। ইদে কিছু টাকা জমিয়ে সন্তানদের এখানে নিয়ে এসেছি। যদিও এইখানে পর্যাপ্ত পশুপাখি নাই তাও ওদের মুখের এই চওড়া হাসিটার সামনে পৃথিবীর সব কষ্ট এক নিমেষে ভুলে যাওয়া যায়।
তবে এই উৎসবের আমেজ সবার জন্য না। হাজারও মানুষ আনন্দের ভেলায় ভাসছে, তখন আইবাঁধের এক কোণে চটপটি বিক্রি করছিলেন মধ্যবয়সী রহিমা বেগম। উৎসবের এই ভিড় তাঁর কাছে আনন্দের চেয়েও বেশি জীবিকার এক বড় সুযোগ। রহিমা বেগম বলেন, মানুষ যখন হাসিমুখে আমার দোকানে খায়, তখন নিজেরও ভালো লাগে। বড়লোকদের ইদ আনন্দের। আর আমাদের ইদ হলো দুটো বেশি বিক্রির। দিনশেষে সন্তানদের হাতে নতুন জামা আর ভালো খাবার তুলে দিতে পারলেই আমাদের ইদ সার্থক।
মানুষের এই উপচে পড়া ভিড়কে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন ছোট ছোট হকার ও দোকানিরা। চটপটি-ফুচকা, আইসক্রিম আর খেলনা বিক্রেতাদের মুখেও ইদের হাসি। এক ফুচকা বিক্রেতা হাসিমুখে জানালেন, “বছরের অন্য দিনগুলোর চেয়ে ইদের এই কয়েকদিন বিক্রি খুব ভালো হয়। আমাদের ইদ তো আসলে এই মানুষগুলোর আনন্দের মাঝেই লুকিয়ে থাকে।”
এছাড়া নগরীর রেস্টুরেন্ট গুলোতেও যেন পা ফেলার জায়গা নেই, সবাই ঘুরাঘুরি শেষ করে পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসেছে এইখানে। রেস্টুরেন্টের সামনে বেলুন বিক্রি করছিলেন রহমত আলী। যখন পুরো শহর আনন্দের জোয়ারে ভাসছে, তখনো তাঁর হাত দুটো ব্যস্ত জীবিকার টানে। মৃদু হেসে রহমত আলী বলেন, মানুষ ঘুরতে বের হয়েছে, আমার বেলুন বিক্রি ভালো হচ্ছেÑএটাই আমার ইদ। আমরা গরিব মানুষ বাবা, আমাদের আবার ইদ কী! ইদের দিন সকাল থেকে রোদের মধ্যে বেলুন নিয়ে ঘুরছি। মানুষজন খুশি মনে বেলুন কেনে, কিন্তু আমাদের কপালে শুধু দূর থেকে মানুষের আনন্দ দেখাই লেখা। আমাদের মতো মানুষের ইদ আসে শুধু বড়লোকদের আনন্দ জোগাতে, নিজেদের আনন্দ করার জন্য না।”