রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

পরাজয়ের গ্লানি ঘুচাতে বাংলাদেশের কোর্টে বল ঠেলে দিচ্ছেন মমতা

সোনার দেশ ডেস্ক ০৪ জুন ২০২৬ ০৯:৩৯ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৪ জুন ২০২৬ ০৯:৩৯ অপরাহ্ন
পরাজয়ের গ্লানি ঘুচাতে বাংলাদেশের কোর্টে বল ঠেলে দিচ্ছেন মমতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বিস্ফোরক মন্তব্যকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিশ্লেষকরা বলছেন, মমতা দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেছেন।


একইসঙ্গে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বল বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন। 


ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ করে এই ধরনের বক্তব্য কেন দিলেন তা নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, মমতা মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ওসমান হাদির খুনিরা ভারতে ধরা পড়ে।


সে সময় হয়তো তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তবে তার মানে এই নয় যে, এই খুনের সঙ্গে জড়িত ভারত।


এখন সেটা নিয়েই রাজনীতি করতে চাইছেন মমতা। তবে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বল বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন।


যেটা সমীচীন নয়।


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিস্ফোরক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মন্তব্য জানতে চাইলে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. দেবজ্যোতি চন্দ বাংলানিউজকে বলেন, ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মতো উচ্চ ও দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকলে একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই অনেক রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ও গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকেন। তাছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি আজীবন এই পদে থাকেন না। সমগ্র ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আমাদের অনেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। কিন্তু আমি মমতা ব্যানার্জীর মতো এত দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আর কাউকে করতে দেখিনি, বিশেষ করে যখন বিষয়টি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে জড়িত পররাষ্ট্রনীতির মতো একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত।


ড. দেবজ্যোতি আরও বলেন, মমতা যদি নিজের আচরণ শুধরে না নেন, তবে তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সতর্ক করা হোক। নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়ে তিনি দৃশ্যত ভারসাম্য হারিয়েছেন অথবা তিনি অতিরিক্ত চালাক সাজার চেষ্টা করছেন। তিনি মরিয়া হয়ে নির্লজ্জভাবে দেশের ভেতরে ও বাইরে উভয় দিকেই সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। দেশের আরও ক্ষতি করার আগেই এটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।


যেভাবে দেখছে বাংলাদেশ সরকার

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত নয় বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।


পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, একটা নির্বাচন হয়েছে পাশের দেশে। যিনি হেরে গেছেন তিনি বলছেন, ওনাদের সরকারকে উদ্দেশ্যে করে। সেটা নিয়ে এখানে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত হবে না বলে আমি মনে করি। এটা আমাদের আলোচনা করার মতো বিষয় নয়।


তিনি বলেন, অলরেডি এটা নিয়ে কাজ চলছে; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব সিরিয়াসলি কাজ করছে। হাদি হত্যার বিচার আমরা চাই এবং যারা ধরা পড়েছে ভারতে তাদের ফেরত এনে বিচার বাস্তবায়ন করতে হবে এবং দ্রুত করতে হবে। সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট আছি।


শামা ওবায়েদ বলেন, হাদির হত্যাকারীদের ফেরত আনতে হলে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে আনতে হবে। সে ব্যাপারে আমরা সিরিয়াসলি কাজ করছি। এটা ভালোই এগিয়েছে। আমরা ওইদিকে আগাতে চাই। এটা নিয়ে তারা (ভারত সরকার) বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কথা বলে, সেটা আমরা দেখব।


কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চুপ-মামলা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য ঘিরে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এই বক্তব্যের জন্য মমতার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভারতের শিলিগুড়ির আইনজীবী রিংকি সেন চট্টোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় তিনি মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, একজন প্রাক্তন সাংবিধানিক পদের অধিকারী হয়ে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ ও গোপন তথ্য এভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেন না। এই ধরনের মন্তব্যের ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।


কী বলেছিলেন মমতা

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যা ঘটনাকে ইঙ্গিত করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার ধর্মতলায় মঙ্গলবার (২ জুন) এক জনসভায় দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের স্বার্থে এ বিষয়ে মমতার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন। মমতা বলেন, কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? সবটাই জানি।


মমতা আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভোল্যুশন হয়েছিল।...মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। তারপর হোম মিনিস্টার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নিজে আমাকে ফোন করে বলেছেন...এত দিন তো কই আমি বলিনি, মুখ খুলিনি...আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে...আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি।


ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে মারা যান।


পরবর্তীতে ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেন গত ৮ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হন। দুই খুনিকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।


তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ