নগরীতে বাড়ছে অটোরিকশা ভাড়া, জানে না সিটি করপোরেশন
রাজশাহী মহানগরীতে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ভাড়া। সোমবার (১৫ জুন) থেকে এই ভাড়া কার্যকর হবে। ভাড়া বাড়ানো নিয়ে একটি লিফলেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়াও এ ধরনের লিফলেট ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক ও যাত্রীদের দেওয়া হচ্ছে। তবে এই বিষয়ে জানে রাজশাহী সিটি করপোরেশন।
রাজশাহী মহানগরীর অটোরিকশার ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে সিটি করপোরেশন। ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিটি করপোরেশন ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। ৫ টাকার ভাড়া না বাড়িয়ে দূরের যাত্রার ভাড়া বাড়িয়েছিল সিটি করপোরেশন। রুট অনুযায়ী আগের সাত টাকার ভাড়া আট টাকা, ১০ টাকার ভাড়া ১২ টাকা ও ১৫ টাকার ভাড়া ১৭ টাকা করা হয়েছিল। এরপর ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে ২০২২ সালের আগস্ট মাসে দুইদিন ধর্মঘট পালন করেন চালকরা। তবে, সেসময়ও ভাড়া বাড়ানো হয়নি। তবে এবার ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে সরব হয়েছেন চালকরা।
তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আর ভাড়া বাড়াতে হলে সবার সম্মতি প্রয়োজন।
ছড়িয়ে পড়া লিফলেটে ভাড়া বৃদ্ধির কারণ বলা হচ্ছে। তবে কারা এই লিফলেট কারা দিয়েছে তা উল্লেখ নেই কোথাও। ৫ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করা হচ্ছে। এর কারণও বলা হয়েছে। লিফলেটে লেখা হয়েছে, ‘পূর্বের দাম গাড়ি ১ লাখ ৬০ হাজার, বর্তমান দাম ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
ব্যাটারি ৪৫ হাজার হাজার টাকা, বর্তমান ৮০ হাজার টাকা। টায়ার ৮৫০ টাকা, বর্তমান ২ হাজার ৪০০ টাকা। রোড মামলা ৩০০ টাকা, বর্তমানে ২ হাজার ৬০০ টাকা। চার্জার বিল ১০০ টাকা, বর্তমানে ২২০ টাকা। ব্রেক সু ১৬০ টাকা, বর্তমানে ৩৬০ টাকা।’
লিফলেটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে গাড়ি সার্ভিসিং ও মেকানিজ/মেকার খরচও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা আমাদের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উল্লেখ্য, বিগত ১৭ বছর যাবত ৫ টাকা ভাড়া চলমান রয়েছে। আগামী ১৫/০৬/২০২৬ তারিখ হইতে উপরে উল্লিখিত যথাযথ কারণে ১০ টাকা ভাড়া কার্যকর করা হইবে। সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ, আমরা আশা করি ভাড়া বৃদ্ধির এই যথাযথ দাবির সাথে একমত প্রকাশ করে আমাদের পাশে থাকবেন।’
তবে ভাড়া বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন যাত্রীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাড়া নিয়ে তারাও কথা বলছেন। ভাড়া বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক দাবি করে যাত্রীরা বলছেন, সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের দামে হিমসিম খাচ্ছে। এর মধ্যে অটোরিকশার ভাড়া বাড়লে সমস্যা আরও বাড়বে। বৃহস্পতিবার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। আর নগরীর মধ্যে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এমনভাবে ভাড়া বাড়ানোটা ঠিক হচ্ছে না।
দ্যা বিউটি অফ বাংলাদেশ পেজে বলা হয়, ‘১০ টাকা অটো ভাড়া কোনোভাবেই মানা যায় না- রাজশাহীর মতো শিক্ষানগরীতে। যেখানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। রাজশাহীর অটোরিকশার এই হয়রানি বন্ধ করতে দ্রুত সিটি সার্ভিস বাস নামানোর দাবি জানাই সিটি করপোরেশনকে। রাজশাহী শহরকে যেখানে আধুনিক শহর বলা হয়- এই শহরের সুনাম ধরে রাখতে ইলেকট্রনিক ফ্রি বাস নামানো উচিত শহরজুড়ে। আর অবৈধ অটো ও রিকশা বন্ধ করা উচিত।’
নেটিজেনরাও বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। সুকুমার রবিদাস লেখেন, ‘ভাড়া তেমন প্রবলেম না, অটো সবচেয়ে বড় প্রবলেম
এরা রাস্তায় কোন শৃংখলা মানে না। দুর্ঘটনার বড় একটা কারণ হলো এই অটো।’ আঁখি আলমগীর নামের আরেকজন লেখেন, ‘সব কিছুর দাম বাড়াইছে ঠিক আছে, বাট- তাই বলে ৫ এর ভাড়া ১০? মগের মুল্লুক? মানে ডাবল?’ শাহ মাসুদ আহমেদ নামের আরেকজন লেখেন, ‘৫ টাকা ভাড়া ৫ টাকায় থাকবে। কোন হাংকিপাংকি চলবে না। ফাজিলদের অজুহাতের অভাব নেই।’
সোহানুর রহমান বিপুল লেখেন, ‘৫ টাকার কাছে ৭ টাকা হতে পারে তাই বলে ১০ টাকা এক লাফে।’ রবিউল ইসলাম লেখেন, ‘৫ এর স্থানে ৭, মানা যায় এর বেশি নয়’।
সামিরুল ইসলাম নামের একজন লেখেন, ‘রাজশাহী কোর্ট হইতে সাহেব বাজার ভাড়া ছিল ৭ টাকা, সেটা বেশ কিছুদিন আগে থেকে রাতারাতি হয়ে গেছে ১০ টাকা। রাজশাহী কোর্ট হইতে রেলস্টেশনের ভাড়া ছিল ১২ টাকা সেটা অটোমেটিক হয়ে গেছে ১৫ টাকা। তাহলে বাড়ানোর জন্য লেখালেখি করার দরকার কি?
হুমায়ুন কবীর লেখেন, ‘অটোরিকশা উঠে গেলে ভালো হয়। পাঁচ টাকার ভাড়াতে না পোষালে গাড়ি চালালো ছেড়ে দিতে হবে। সময় বুঝে তো পাঁচ টাকার ভাড়া দশ টাকা নিয়ে নেয়।’
আব্দুর রহমান নামের আরেকজন লেখেন, ‘অটোর জন্য যে হয়রানির শিকার রাজশাহীবাসি এটার কী? প্রতিদিন এত অটো চার্জ দেওয়ার কারণে কারেন্ট কত অপচয় হয় হিসাব আছে? আগে অটোর সংখ্যা কমান তারপর ভাড়া বাড়ানোর চিন্তা মাথায় আনেন। আর প্রতিটা অটোওয়ালার আগে ড্রাইভিং লাইসেন্স করান।
রাজশাহী জেলায় ইজিবাইক ও অটোরিকশা কত চলাচল করে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (পাঁচ আসন) এবং ৬ হাজার অটোরিকশা (দুই আসন) নগরে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এই অটোগুলো রাসিক লাল ও সবুজ রঙ করে দিয়েছে। এই দুই রঙের অটোগুলো দুই সিফটে চলাচল করে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, নগরীতে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করে। যদিও সিটি করপোরেশনের রেজিস্ট্রেশন আছে মাত্র ১৬ হাজার। চ্যাসিস নম্বর না থাকায় একই রেজিস্ট্রেশন দিয়ে চলছে একাধিক গাড়ি। ফলে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, লক্ষ্মীপুর মোড়, গোরহাঙ্গা রেলগেট, বন্ধগেট, কাদিরগঞ্জ-দড়িখরবোনা মোড়, বর্ণালীর মোড়, লোকনাথ স্কুল মার্কেট মোড়, রাজশাহী কলেজ গেট, সোনাদিঘীর মোড়, আলুপট্টির মোড়, কাজলা মোড়, বিনোদপুর বাজার, ভদ্রা, শালবাগান বাজার, নওদাপাড়া বাজার ও কোর্ট বাজারগুলোতে অটোরিকশার জট লেগেই থাকে। এই জটলা থামাতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ।
জাতীয়তাবাদী অটোরিকশা চালক দলের রাজশাহী মহানগরীর আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মানা বলেন, আমরাও লক্ষ্য করছি কে বা কারা একটি লিফলেট বিতরণ করে বেড়াচ্ছে। এই মূহূর্তে আমরা চাচ্ছি না অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি পাক। ভাড়া বাড়ানোর নিয়মও আছে। রাসিক প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া বাড়াতে হবে। আমরাও খোঁজ করছি কারা এই কাজ করেছে। প্রয়োজন হলে আমরা আইনত ব্যবস্থা নেব।
রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাইদ বলেন, ভাড়া বাড়ানোর কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়েও আমরা কিছু জানি না। তবে কেউ আলোচনা না করে ভাড়া বাড়াতে পারবে না।