পদ্মার চরে বাদামের বাম্পার ফলন, অনাবাদি বালুচরে ফিরছে কৃষকের স্বপ্ন
একসময় বছরের পর বছর পদ্মা নদীর জেগে ওঠা চরে ছিল শুধু ধু-ধু বালুচর। বর্ষায় তলিয়ে যেত, শুকনো মৌসুমে পড়ে থাকত অনাবাদি জমি। সেই পতিত চরেই এখন সবুজের সমারোহ। বালুচরের বুকজুড়ে দুলছে চিনা বাদামের খেত। উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের রানীনগর চরে এবার চিনা বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর যৌথ উদ্যোগে উন্নত জাতের বীজ, কারিগরি পরামর্শ এবং নিয়মিত মাঠ তদারকির ফলে চলতি রবি মৌসুমে রানীনগর চরজুড়ে ব্যাপক আকারে চীনা বাদামের আবাদ হয়েছে। চলতি রবি মৌসুমে পদ্মার জেগে ওঠা রানীনগর চরসহ আশপাশের প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ বিঘা জমিতে চীনা বাদামের চাষ হয়েছে। কয়েক বছর আগেও পতিত পড়ে থাকা এসব জমি এখন লাভজনক আবাদে পরিণত হয়েছে।
রানীনগর চর ঘুরে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ বাদাম খেত। কোথাও কৃষক বাদাম তুলছেন, কোথাও শুকানোর জন্য জমিতে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সদ্য উত্তোলিত গাছ। কয়েক বছর আগেও যেখানে শুধু বালু উড়ত, সেখানে এখন কৃষকদের ব্যস্ততা আর স্বপ্নের ফসল।
কৃষকরা জানান, আগে এই চরজমিতে কোনো ফসলই হতো না। পদ্মার পানি সরে যাওয়ার পর নতুন চর জাগলেও কী চাষ করবেন, তা নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। পরে কৃষি বিভাগ ও ‘বিনা’র পরামর্শে পরীক্ষামূলকভাবে চীনা বাদামের আবাদ শুরু করি । প্রথম বছরেই ভালো ফলন হওয়ায় এখন শত শত কৃষক এই চাষে যুক্ত হয়েছেন।
স্কুলশিক্ষক ও কৃষক মহব্বত আলী বলেন, আগে এই জমি মরুভূমির মতো পড়ে থাকত। বিনা অফিস আমাদের উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছে। বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার বাদাম বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। সব খরচ বাদ দিয়েও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। এখন আমাদের দেখে এলাকার অনেক কৃষক বাদাম চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
কৃষক আবদুর রহমান বলেন, এই চরজমিতে আগে কোনো ফসল হতো না। এখন বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ করে ৩০ হাজার টাকার মতো লাভ হচ্ছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা না পেলে হয়তো আমরা এই সম্ভাবনা দেখতে পেতাম না।
আরেক কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, আমরা কয়েক বছর আগে অল্প পরিসরে বাদাম চাষ শুরু করি। এখন পুরো চরজুড়ে বাদামের আবাদ হয়েছে। বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে। এতে অনাবাদি জমিও কাজে লাগছে, আবার কৃষকের আয়ও বাড়ছে।
তরুণ কৃষক শহীদুল ইসলাম বলেন, মহব্বত আলী ভাইয়ের সফলতা দেখে আমিও বাদাম চাষ শুরু করি। এবার ফলন খুব ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে আবাদ করব।
আলাতুলি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল ইকবাল বলেন, এই এলাকায় আগে কখনো চীনা বাদামের চাষ হতো না। কৃষি বিভাগ ও ‘বিনা’র উদ্যোগে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, রোগবালাই দমন এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়ার কারণে কৃষকরা উৎসাহিত হয়েছেন। প্রতিবছর আবাদের পরিমাণও বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজাদুল হক বলেন, বিনা উদ্ভাবিত চীনা বাদাম-৬, ৮ ও ১০ জাতের বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। একজন কৃষক বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারবেন। আগে যে জমি অনাবাদি ছিল, সেটিই এখন কৃষকের আয়ের নতুন উৎসে পরিণত হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী বলেন, চীনা বাদাম একটি তেলবীজ ফসল, যা বেলে দোঁআশ ও চরাঞ্চলের জমির জন্য খুবই উপযোগী। জেলার নতুন জেগে ওঠা চরগুলোতে অন্য ফসলের তুলনায় এই ফসলের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার বিনা চীনা বাদাম-৪, ৬ ও ৮ জাতের আবাদ করা হয়েছে। বর্তমানে কর্তন চলছে এবং কৃষকরা ফলনে সন্তুষ্ট।
তিনি আরও বলেন, যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে আগামী বছর চরাঞ্চলে আরও বড় পরিসরে চীনা বাদামের আবাদ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এতে শুধু অনাবাদি জমির ব্যবহারই বাড়বে না, চরাঞ্চলের মানুষের আয় ও জীবনমানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মার চরাঞ্চলের অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনার এই উদ্যোগ শুধু কৃষকদের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিচ্ছে। যথাযথ সরকারি সহযোগিতা, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণ সহজ করা গেলে চীনা বাদাম ভবিষ্যতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসলে পরিণত হতে পারে।