রাজশাহীর পোলট্রি শিল্পে মন্দা
উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ডিম ও মুরগির দাম কম। সেই সাথে বেড়েছে সিন্ডিকেট এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব। সব মিলিয়ে রাজশাহীর পোলট্রি শিল্পে নেমে এসেছে মন্দা।
টানা লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে গত এক দশকে জেলার অর্ধেকেরও বেশি প্রান্তিক ও মাঝারি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। পুঁজি হারিয়ে অনেক উদ্যোক্তা এখন ঋণের জালে জর্জরিত। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের খামারি সোহেল রানা। মাসের পর মাস লোকসান গুনেছেন। সবশেষ তিন লাখ টাকা লোকসান মাথায় নিয়ে, নিজের ব্রয়লার খামারটি ভেঙে ফেলেছেন।
গত সোমবার খামার ভাঙার সময় তিনি জানান, তার গ্রামে অন্তত ৫০ জন খামারি গত দুবছরে খামার ভেঙে ফেলেছেন।
রাজশাহী পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, মাত্র এক দশক আগেও পবার মল্লিকপুর, পারিলা, কুখন্ডি, রনহাট, মোসলেম ও আশরাফের মোড়সহ পাশের এলাকাগুলোতে প্রায় ৩ হাজার পোলট্রি খামার ছিল। কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের মুখে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৩০০টি খামার। অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, গত কয়েক বছরে খামার বন্ধ হওয়ার এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যা পুরো জেলাজুড়েই দৃশ্যমান।
খামারি ও পোলট্রি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে মুরগির খাবার, ভ্যাকসিন, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে লাগামহীনভাবে। কিন্তু সেই তুলনায় ডিম বা মুরগির বিক্রয়মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পবার মোসলেমের মোড় ডিমের আড়ত সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ বর্তমানে সাড়ে ৯ থেকে ১০ টাকা। লোকসান দিয়ে খামারিদের সেই ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ১০ টাকায়। ফলে প্রতিটি ডিম ও মুরগিতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে ক্ষুদ্র খামারিদের। ফলে প্রান্তিক খামারিরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।
রাজশাহী পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন জানান, পুঁজি হারিয়ে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আজ নিঃস্ব এবং শত শত পরিবার ঋণের দায়ে জর্জরিত।
প্রান্তিক খামারিদের অভিযোগ, এই সংকটের পেছনে রয়েছে বাজার সিন্ডিকেট এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। লোকসানের মুখে কম পুঁজির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যখন বাজার থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, ঠিক তখনই পুরো বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে তুলে নিচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি ভেঙে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহীতে বর্তমানে লেয়ার খামার ১ হাজার ২৮৬টি, ব্রয়লার খামার ২ হাজার ২৮২টি, সোনালি মুরগির খামার ৫ হাজার ৭৫৩টি। এসব খামার থেকে বছরে প্রায় সোয়া ২ লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং সাড়ে ৬০ কোটিরও বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। প্রান্তিক খামার বন্ধ হলেও রাজশাহীতে ডিম ও মাংসের উৎপাদন এখনো বার্ষিক চাহিদার তুলনায় বেশি।
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আতোয়ার রহমান জানান, মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক খামারিরা চরম সংকটে আছেন। প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হরে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে।