মৃত্তিকার ‘আত্মা’ জৈব পদার্থ: অম্লতা দূরীকরণে চুন ব্যবহারে গুরুত্বারোপ
উত্তরাঞ্চলের কৃষিজমিতে মাটির অম্লতা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অম্লতা ফসল উৎপাদনের নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় চুন ও ডলোমাইটের সঠিক ব্যবহার এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) সকালে রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্র, রাজশাহী-এর সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত দিনব্যাপী সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘চুন প্রযুক্তি ও জৈব পদার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে অম্ল মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সেমিনার: মৃত্তিকার আত্মা’ শীর্ষক এ আয়োজন করে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট রাজশাহী কার্যালয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি।
সভাপতিত্ব করেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. আফছার আলী। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির অ্যানালাইটিক্যাল সার্ভিসেস উইংয়ের পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর কৃষিতত্ত্ব ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নূরুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিভাগীয় গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম আমিনুল ইসলাম। প্রবন্ধে অম্ল মৃত্তিকা সৃষ্টির কারণ, ফসল উৎপাদনে এর প্রভাব এবং চুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, ফসলের জন্য ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন, যার মধ্যে কার্বন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন বায়ু ও পানি থেকে গ্রহণ করা হলেও বাকি উপাদানগুলো মাটি থেকেই নিতে হয়। মাটির পিএইচ মান ৫.৬ থেকে ৭.৩-এর মধ্যে থাকলে এসব পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য হয়। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের বড় অংশের মাটি বর্তমানে অতিমাত্রায় অম্ল, ফলে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও মলিবডেনামের ঘাটতি এবং অ্যালুমিনিয়াম ও আয়রনের বিষাক্ত প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর ফসলি জমির মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ জমি অত্যধিক বা অধিক অম্লতায় আক্রান্ত বলে সেমিনারে জানানো হয়। এতে ফসলের শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
গবেষকদের মতে, ডলোমাইট প্রয়োগের মাত্রা মাটির পিএইচ, জৈব পদার্থ ও বুনটের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে প্রতি শতাংশ জমিতে ৩ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ডলোমাইট প্রয়োগ করা যেতে পারে—বেলে মাটিতে কম এবং এঁটেল মাটিতে বেশি মাত্রায়। সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে মাটির অম্লতা কমে এবং পুষ্টি গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
বক্তারা আরও বলেন, মাটিতে জৈব পদার্থ কমে গেলে এর পানি ধারণক্ষমতা ও উর্বরতা হ্রাস পায়। তাই জৈব পদার্থকে মৃত্তিকার ‘আত্মা’ বলা হয়। গোবর, কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট ও সবুজ সার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির গঠন উন্নত করা সম্ভব।
তারা জোর দিয়ে বলেন, শুধু রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটি পরীক্ষাভিত্তিক চুন ও জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুস্থ ও প্রাণবন্ত মৃত্তিকা অপরিহার্য। তাই ‘মৃত্তিকার আত্মা’ ফিরিয়ে আনতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।