বগুড়ায় কমছে পুষ্টিগুণে ভরা কাউনের চাষ
একসময় গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র মানুষের অন্যতম প্রধান খাদ্য ছিল কাউন। ভাতের বিকল্প হিসেবে কাউনের ভাত, পায়েস, ক্ষীর, খিচুড়ি, পোলাও ও পিঠার ব্যাপক প্রচলন ছিল। সেইসাথে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং কম খরচে কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল কাউন চাষ। এক সময় অবহেলিত ও হারিয়ে যেতে বসা এই পুষ্টিকর দানা জাতীয় ফসলটি এখন কৃষকদের ভাগ্য বদলের নতুন হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি আর নেই, বর্তমানে বাজার মূল্য অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক অসংগতি। কম সেচ, সামান্য সার এবং নামমাত্র পরিচর্যায় ভালো ফলন হয়। কিন্ত তুলনামূলক বাজারমূল্য আশানুরূপ না হওয়ায় বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী শস্যের চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বগুড়ার কৃষকরা।
চলতি মৌসুমে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চলে কাউনের আবাদ হয়েছে। তবে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধান, গম, ভুট্টা, মরিচ ও মিষ্টিকুমড়ার মতো অধিক লাভজনক ফসলের দিকে কৃষকদের ঝোঁক বাড়ায় কাউনের আবাদ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
গত কয়েক দশক আগে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে কাউন ছিল প্রধান অর্থকারি ফসল। কাউন এর চাল দিয়ে আপতকালিন দিন পার করতো চরের পরিবার। দিনবদলে ফসলের রকমারি চাষ হয়েছে। এখন কাউনের চাহিদা অনেকটাই কমে আসছে। এ ফসল মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি বাড়িতে পোষা পাখি, কবুতর ও নানা প্রকার পাখিদের খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। পাখির খাবারের কারণে ২০ টাকা কেজির কাউন এখন খোলা বাজারে বিক্রি হয় ৮০ টাকা কেজি। পাখি খাদ্য ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক পিঠা, মুঠা, পায়েস তৈরীতে কাউনের চালের ব্যবহার রয়েছে। বেকারি শিল্পেও রয়েছে কাউনের চালের চাহিদা। চরাঞ্চলে কিছু কিছু ফসল কোনরূপ পরিচর্যা ছাড়াই শুধুমাত্র বপন করলেই ভাল ফলন পাওয়া যায়। এগুলো হলো কাউন, খেরাছী (চিনা), মাস কলাই, খেসারী কালাই, মসুর কলাই, কালোজিরা, প্রভুতি। এগুলোর মধ্যে চড়া দামের জন্য প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে কৃষকরা কাউনকে বেছে নিয়েছেন। মাত্র ৭০ থেকে ৯০ দিনেই ফসল সংগ্রহ করা যায় বলে এর ফলন পেতেও কম সময় লাগে। মাঘ ফালগুন মাসে জমিতে মাত্র একটি বা দুইটি চাষ দিয়েই কাউনের বীজ জমিতে ছিটিয়ে বপন করা হয়।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় চরাঞ্চলে ব্যাপক পরিসরে কাউনের চাষ হলেও বর্তমানে মূলত যেসব জমিতে সেচের সুবিধা নেই, সেসব জমিতেই এ ফসলের আবাদ হচ্ছে। কাউন খরা সহিষ্ণু হলেও বৃষ্টিনির্ভর ফসল। এ বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর কাউন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫১৫ হেক্টর। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে এ ফসলের আবাদ হয়েছে। প্রতি বিঘায় গড়ে ৪ থেকে ৫ মণ ফলন পাওয়া গেছে। ফসলটির জীবনকাল ১০০ থেকে ১২০ দিন এবং পরিচর্যার প্রয়োজনও তুলনামূলক কম।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ কাউন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এই মূল্য কম হওয়ায় কৃষকরা কাক্সিক্ষত লাভ পাচ্ছেন না।
উপজেলার চর বাটিয়া গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া বলেন, এ বছর ১২ বিঘা জমিতে কাউনের আবাদ করেছি। সাধারণত যেসব জমিগুলো আমাদের পতিত থাকার সম্ভাবনা থাকে, সেইসব জমিতে আমরা কাউনের আবাদ করি। এ ফসল চাষে পরিচর্যা খুবই কম, শুধুমাত্র বপন করলেই হয়। সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ বছর গড়ে বিঘাপ্রতি ৫ মণ করে কাউনের ফলন পেয়েছি। তবে বাজারে আশানুরূপ দাম পাচ্ছি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউন শুধু লাভজনকই নয়, এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর এই চাল দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণে দারুণ কার্যকর। কাউন চাল সাধারণত, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে, ওজন কমাতে সহায়তা করে, হজমে সহায়তা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, এটি হৃদরোগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও খনিজ থাকায় এটি হাড় মজবুত করতে এবং প্রোটিন শরীরের পেশি গঠনে সহায়তা করে। কাউনের চালে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ও ভিটামিন ত্বককে সতেজ ও মসৃণ রাখতে সাহায্য করে। তাইতো শহরাঞ্চলে কাউনের চাহিদা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ বলেন, বর্তমানে কাউন পাখির খাদ্য হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হলেও এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্যশস্য। নতুন প্রজন্মের মধ্যে কাউন দিয়ে তৈরি খাবারের চাহিদা কমে গেছে। তবে এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা আবারও এ ঐতিহ্যবাহী ফসলের চাষে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন বলে ওই কর্মকর্তা দাবী করেন।