ইউপি নির্বাচন: তফসিল ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে, আইনশৃঙ্খলায় জোর
স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপের তফসিল ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে কমিশন। পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করতে চায় ইসি।
এদিকে, নির্বাচনি প্রস্তুতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা নেওয়া, ভোটকেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো এবং আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ধাপের ভোট সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। পাশাপাশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনে তাদের সহযোগিতা চাইবে ইসি। অতীতের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা, প্রাণহানি ও প্রভাব বিস্তারের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে।
সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হয়। সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ভোটের তারিখ ঘোষণা করেন। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটগ্রহণের প্রায় ছয় সাপ্তাহ আগে তফসিল ঘোষণা করবেন। সে হিসাবে প্রথম ধাপের তফসিল ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘোষণা করা হবে।
পাঁচ ধাপে ভোট, প্রথম ধাপে প্রায় ৮০০ ইউপি
ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপে ইউপি নির্বাচন শুরু হবে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন এ সময়ের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনায় সদর উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে বা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বকেয়া রয়েছে, সেগুলোও অগ্রাধিকার পাবে। পরবর্তী ধাপগুলোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুবিধা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইউনিয়ন ও উপজেলা বাছাই করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “প্রথমে সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও সময়ের স্বল্পতার কারণে তা পাঁচ ধাপে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগামী ছয়-সাত মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি দুটি ঈদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও বিশ্ব ইজতেমার সময়সূচি বিবেচনায় নিতে হয়েছে কমিশনকে। সব ধাপের ভোট বৃহস্পতিবার আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পৃথক বৈঠক
ইউপি নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কমিশন। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে নির্বাচনি নিরাপত্তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে চায় ইসি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আগে একটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক হয়েছিল। সেখানে বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে নভেম্বরের মধ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শেষ করার কথা জানানো হয়েছিল। নির্বাচনের আগে আবারো পৃথকভাবে বৈঠক করে নিরাপত্তা প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হবে।”
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনায় ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত চলাচল এবং ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাওয়া-আসা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রয়োজনে জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পেশিশক্তির ব্যবহার ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কমিশন।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগও রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকায় সংঘটিত অনিয়ম, সহিংসতা কিংবা দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এদিকে, ইউপি নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা নিতে চায় নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনে সহযোগিতা চাওয়া হবে।
প্রায় এক দশক পর দলীয় প্রতীক ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা, প্রভাব বিস্তার ঠেকানো এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে দলগুলোর সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে কমিশন।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে কঠোর অবস্থান
নির্বাচনি আচরণবিধি বাস্তবায়নেও কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া কিংবা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রয়েছে। সহিংসতা, ভয়ভীতি বা অনিয়মের কারণে কোনো কেন্দ্রের ভোটের ফল প্রভাবিত হলে সেই কেন্দ্রের ফল স্থগিত কিংবা নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন। নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচন ও সামগ্রিক প্রস্তুতির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোটগ্রহণের ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করবেন। নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার নির্বাচনি পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতাও চাওয়া হবে। ভোটাররা যেন ভয় ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে চায় কমিশন।”
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি