শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

স্লুইস গেট বন্ধ রেখে অবৈধ সৌঁতিজালে মাছ শিকার নাটোরে ১৫ বিলের ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা

WP Import ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৪:৫৪ অপরাহ্ন
WP Import ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৪:৫৪ অপরাহ্ন
স্লুইস গেট বন্ধ রেখে অবৈধ সৌঁতিজালে মাছ শিকার নাটোরে ১৫ বিলের ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা
স্লুইস গেট বন্ধ রেখে অবৈধ সৌঁতিজালে মাছ শিকার নাটোরে ১৫ বিলের ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা


নাটোর প্রতিনিধি :


নাটোরের সিংড়ায় গদাই নদীর পাডে প্রভাবশালীদের দখলে বড় শাঐল স্লুইসগেট বন্ধ রেখে বছরের পর বছর অবৈধ সৌঁতিজাল দিয়ে মাছ শিকার চলছে। সেরকোল মরাগাঙ্গীনা নদীর জায়গা দখল করে পুকুর খনন করার পাশাপাশি বাঁধ ও পাকা স্থাপনা করে মাছ ধরছে একটি স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠি ।

এর ফলে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ বছর ধরে চলে আসছে ১৫ বিলের ৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। উপজেলার সেরকোল, হাতিয়ানদহ, লালোর কলমের ৪টি ইউনিয়ন এবং সিংড়া পৌরসভার অংশে ৪০ গ্রামের কৃষক পড়েছেন চরম বিপাকে। বোরো ও রবিশস্য আবাদও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

স্খানীয়দের অভিযোগ বার বার এমপি মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলেও কোন প্রতিকার মিলছে না। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের আশার বানীই সার। চক্রটি নদীর জায়গা ও খাল-জলাশয় দখল করে কোটি কোটি টাকার সম্পদ ভোগ করছেন আর সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, নাটোরের সিংড়া উপজেলার হাতিয়ানদহ ইউনিয়নের বড় শাঐল নামক স্খানে ১৯৯৪-৯৫ সালে পানির স্রোতে গদাই নদী পাড ভেঙ্গে যায়। তৎকালীন জামায়াতে ইসলামির সিংড়া ৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুবক্কর সিদ্দিকির মৃত্যু হলে বিএনপি থেকে অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদ মাত্র ৯ মাস জন্য এমপি নির্বাচিত হন।

ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তৃীর্ণ এলাকার ফসল রক্ষায় সেরকোল, হাতিয়ানদহ এবং তৎকালিন তাজপুরে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে (এডিপি) আর্থিক সহায়তায় সাড়ে ৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বড় শাঐল স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। পরে আরও পঞ্চাশ হাজার যুক্ত করা হয়। বর্তমানে ওই স্লইসগেটটি স্থানীয় মসজিদের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রভাবশালীরা দখলে রেখেছে।

প্রতিবছর তারা ইচ্ছামত স্লুইসগেট খোলে। উপজেলার লালোর, সেরকোল, হাতিয়ানদহ ও কলম- এই চারটি ইউনিয়ন এবং সিংড়া পৌরসভার নিঙ্গইন ও শৈলমারী এলাকায় অন্তত ১৫টি বিলে নদীর পানি প্রবেশ করে। বর্ষা শেষে বড় শাঐল জোলার পানি নিষ্কাশন বন্ধ রেখে স্লুইসগেটটি মাছ ব্যবসায়ীদের ইজারা দেয়া হয় ১০-১৫ লক্ষ টাকায় । এবছরও প্রায় ৮ লক্ষ টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে।

বুধবার (২৯ অক্টোবর) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সেরকোল, হাতিয়ানদহ এবং লালোর ইউনিয়নে ১৩টি বিল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিল হচ্ছে রাখশা, ভাষাউড়া, হিয়ালা, মাইস্যাগাড়ী, লক্ষ্মীতলা, পোচাকান্দুরা, খামাইর‌্যাকল, দয়ার বিল, কোমা-কামারের চোরা ও লেলিয়া।

এসব বিলের পাড়ে রয়েছে সেরকোল, শ্রীরামপুর, কংশপুর, হারোবাড়িয়া, সোনাপুর,পমগ্রাম, পুঠিমারী, পাঁচবাড়িয়া, কুশাবাড়ি, খাগোরবাড়িয়া, নতুনপাড়া, বড়শাঐল, পাটশাঐল, বড় বেলঘরিয়া, মাধারিগ্রাম মাঝগ্রামসহ ৪০টি গ্রাম। বিলের মধ্যে কোথাও এক মানুষ, কোথাও এক বুক পানি। আবার কোথাও হাঁটু ও মাজা পানি। এর মধ্যে কিছু উচু জমিতে কাঁচা-পাকা ধান বাতাসে দুলছে। নৌকা নিয়ে অনেক কৃষক জমি দেখছেন, কবে তার জমি, থেকে পানি কমবে আর তখন বোরো ধানের বীজতলা তৈরি করবেন। অনেক মাঠ জুড়ে ঘাষ আর কচুরিপানাতে ভরপুর।

বিলের কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের জায়গা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব গ্রামের হাজার হাজার কৃষকের কষ্টে অর্জিত ফসল এখন পানিতে ভাসছে। অনেক খেতের উঠতি ফসল পানিতে নিমজ্জিত। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, তলিয়ে যায় জমির কাঁচা-পাকা ধান।

পুঠিমারী গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মোক্তার আলী বলেন, ‘বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বর্ষা মৌসমে সাড়ে ১০ বিঘা ধান আবাদ করছিলাম। এখন সব ধান পানির নিচে। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই অবস্থা, এখন কী খাবো কী নিয়ে আবাদ করবো? জলাবদ্ধতার কারণে কেন বছরের পর বছর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি?’ একই অবস্থা এলাকার অন্য কৃষক-মুনজেল মোল্লা, কুদরত আলী, ইউসুব আলী, মনোয়ার, আব্দুল শেখ, জোচন মোল্লা, পমগ্রামের রাশেদুল রাশি, শামছুল মাস্টারসহ, বন্দর আকপাড়া, মাছপাড়া ও পাঁচপাড়ার রাজ্জাক, ছোট্ট, অনুকুলসহ অনেক কৃষকের।

স্লুইসগেট ইজাদার ও স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী খোরশেদসহ অন্যরা বলেন, ‘স্থানীয় মসজিদের কমিটির নিকট থেকে এবার জোলাটি ৭ লক্ষ ৫৮ হাজার টাকা দিয়া (ইজারা) নিছি বিলের পানির মাছ ধরার জন্য। এসব বিলের পানি বেশি করে ছাইরা দিলে সৌতি জাল টেকে না, ফাইট্যা যায়।’
জোলা কমিটির সভাপতি আব্দুল ওহাব মাস্টার বলছেন, তারা অনেক বছর ধরে জোলাটি মসজিদের নামে ইজারা দেন। এই জায়গা মসজিদকে দান করা হয়েছে, ব্যক্তির নামেও আছে। এসব টাকা দিয়ে মসজিদের উন্নয়নসহ রাস্তা-ঘাট এবং নদীতে একটা ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। প্লাবন ভূমি ও নদীর তীর কিভাবে মসজিদ বা ব্যক্তি মালিকানার হয় ? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নাই।

এবিষয় সিংড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন বলেন, এ বিষয়টি জানার পর, তিনি বড় সাঐল স্লুইসগেট থেকে সৌতি জাল অপসারণ করে পুড়িয়ে দিয়ে আসছেন। তার মতে ওই এলাকায় অন্তত ৪-৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রামের দীর্ঘ দিন থেকে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু অসাধু লোক তারা বাঁধ ও স্লুইসগেট দিয়ে পানি আটকে মাছ শিকার করছে। এতে একটি গোষ্ঠি উপকৃত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। আমরা উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের সমাধানের পথ খুঁজছি।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, সিংড়া উপজেলা চলনবিল অধ্যুষিত এলাকা। এখানে এবার বর্ষায় দীর্ঘদিন পানি অবস্থান করছে। এলাকায় বেশ কিছু গ্রামের কৃষক যারা জমিতে আবাদ করেন তাদের জমি জলাবদ্ধতায় আছে। বড়-সাঐল গ্রামে স্লুইসগেট আছে, এটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে আটকে রাখা হয়েছে। আমরা প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

নাটোর পানি উন্নয়ন বোডের্র প্রকৌশলী মো. রিফাত করিম জানান, গোদাই নদীতে আমাদের একটি রেগুলেটর রয়েছে। এর বাইরে যদি ওয়াটার কন্ট্রোল স্ট্রাকচার থাকে, তা দেখতে হবে। দেখার পরে সেটার কারণে যদি কোন সমস্য হয়ে থাকে, সে বিষয়টি কি করা যায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।