শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

যানবাহনে কাম্পনে সোনামসজিদে ফাটল

WP Import ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০৭ পূর্বাহ্ন
WP Import ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০৭ পূর্বাহ্ন
যানবাহনে কাম্পনে সোনামসজিদে ফাটল
যানবাহনে কাম্পনে সোনামসজিদে ফাটল

ছবি: সংগৃহীত

সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:


সুলতানী আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্মিত ছোট সোনামসজিদ। পাশ দিয়েই ছয় নম্বর জাতীয় মহাসড়ক। জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ৭০ টনেরও বেশি পণ্য নিয়ে আট শতাধিকেরও বেশি ভারি যান চলাচল করে। এসময় দুই পাশের ভবনগুলোতে সৃষ্টি হয় কম্পন। ক্ষণে ক্ষণে দুলতে থাকে ঐতিহ্যের স্মারক সোনামসজিদও।

এরই মধ্যে পুরো স্থাপনাজুড়ে দেখা দিয়েছে অসংখ্য ফাটল। আলগা হয়েছে পাথরের গাঁথুনি। চিড় ধরেছে মূল দেয়াল থেকে মিনার পর্যন্ত। মসজিদটি রক্ষায় নেওয়া কম্পন নিরোধক বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি এখনো। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে চারপাশে সীমানা প্রাচীর দেয়ার পর ছোট সোনামসজিদ রক্ষায় আর কোন কাজ হয়নি। দফায় দফায় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
সোনামসজিদের সীমানার মধ্যে সমাহিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধী। পাশেই শায়িত আছেন আরেক বীর মেজর নাজমুল হক। আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে হয়রত শাহনেয়ামোতুল্লার মাজার, তোহাখানা, দারাসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা। সোনামসজিদসহ এসব স্থাপনা দেখতে প্রতিদিন কয়েকশ পর্যটক আসেন। সুলতানি আমলের শিল্পকর্ম দেখেমুগ্ধ হলেও, অসংখ্য ফাটল মর্মাহত করে তাদের।

প্রতিদিন এই সড়কে আট শতাধিক পন্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। ২০-৭০ টনের অতিরিক্ত পন্যবোঝাই যানবহন চলাচলের কারনে ফাটল দেখা দিয়েছে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে নির্মিত এই মসজিদে। পর্যটকদের মতো মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান স্থানীয় বাসিন্দা, মসজিদটির ইমাম ও কেয়ার টেকাররাও। ঐতিহাসিক নির্দশন রক্ষায় বাইপাশ সড়ক এবং কম্পন নিরোধক বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি গবেষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন শওকত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিতে আছে ঐতিহাসিক ছোট সোনামসজিদ। কারণ পাশেই থাকা সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে দৈনিক শত শত পাথরবাহী ট্রাক যাতায়াত করে। আর এসব ট্রাকে থাকে ২০-৭০ মেট্রিক টনের বেশি পাথর। মসজিদ ঘেঁষে যাওয়ার ফলে এসব অতিরিক্ত পণ্যবাহী ট্রাকের কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সোনামসজিদ। একারণে দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের পাশে সড়ক না রেখে বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম ভুট্টু জানান, দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল হয়েছে শুধুমাত্র বড় বড় পাথরবাহী ট্রাক যাওয়ার কারণে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে বাইপাশ সড়ক নির্মাণ করে ঐতিহাসিক ইসলামীক নির্দশনের এই মসজিদটি রক্ষা করা উচিত। তা না হলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে এই স্থাপনা। যখনই নামাজ পড়ার সময় কোন ট্রাক যায় মসজিদটি কাঁপতে থাকে।

ঐতিহ্যের স্বারকের এই যখন অবস্থা, তখন মসজিদটি রক্ষায় নেওয়া বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন। জানা গেছে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে চারপাশে সীমানা প্রাচীর দেয়া হয়। এরপর আর কোন কাজ হয়নি। সোনামসজিদের সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০০৯ সালে বাইপাস সড়ক নিমাণের প্রকল্প প্রস্তাব করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। প্রস্তাবিত ওই প্রকল্পের উপর ২০১৩ সালে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও হয়। একই বছরের ২৩ মে সড়ক ও জনপথ এবং পরিকল্পনা কমিশনের যৌথ প্রতিনিধি দল সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শনও করেন। কিন্তুগত ১২ বছরেও প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।

গবেষকদের মতে, গঠনশৈলী ও প্রাচীনত্ব নিয়ে সারাবিশ্বে অন্যন্য এক ইসলামিক নিদর্শন ছোট সোনামসজিদ। এটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি লেখক ও গবেষকদের। শিবগঞ্জ আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এবং লেখক ও গবেষক প্রফেসর ড. মোজাহারুল ইসলাম তরু এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষায় সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারন দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়জুড়ে রয়েছে ছোট সোনামসজিদ। তা এমনভাবে ধ্বংস হতে দেয়া উচিত নয়।

দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ছোট সোনামসজিদ ধসে পড়াসহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানায় প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর। সোনামসজিদ গৌড় গ্রুফ অফ মনুমেন্টস বিভাগের তত্বাবধায়ক মো. শাহীনুজ্জামান খান বলেন, মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ঐতিহ্যের ছোট সোনামসজিদ। আমাদের দিক থেকে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়েছে বিকল্প সড়ক বা বাইপাশ সড়ক নির্মাণের জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ধসে পড়বে শত শত বছরে মসজিদটি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিনুর রহমান বলেন, আপাতত বাইপাশ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেই। তবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বিবেচনায় নিয়ে তা রক্ষায় মসজিদের সামনে কম্পন নিরোধক স্থাপন ও ঢালাই সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি শীগ্রই এর কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পন্যবাহী ট্রাকের কম্পনের ফলে ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে ছোট সোনামসজিদ।

প্রসঙ্গত, ঐতিহাসিক ছোট সোনামসজিদের ইতিহাস প্রায় ৫৫০ বছরের। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। দেশীয় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন, সুইজারলান্ড, কুয়েত, ভারত,পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসেন মসজিদটি এক নজর দেখতে।