নতুন বছরে অনিশ্চয়তার অবসান হোক
২০২৫ সাল কেমন গেল, জনজীবনে এর প্রভাবই বা কেমন? দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে তথ্য প্রকাশ করেছে তা রীতিমত উদ্বেগজনক। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এতোই ব্যাপক ও বিস্তৃত যে তা একটি ভীতিকর সমাজেরই সাক্ষ্য দেয়। মানবাধিকারি সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্র ২০২৫-এর শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। সংগঠনটি বলছে-২০২৫-এর অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ছিল মব সন্ত্রাস করে গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ড। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের বছর মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হন অন্তত ১২৮ জন। মব সন্ত্রাস করে নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক অনেক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা, বাউল সম্প্রদায়ের মানুষসহ অনেক মানুষকে হেনস্তা করা হয়েছে, মারধর, জুতার মালা পড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।
এ বছর ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময় দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে হত্যার শিকার হয়েছেন তিন জন সাংবাদিক এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রহস্যজনকভাবে চার জনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। আসক-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত মানবাধিকার সম্পর্কিত সংবাদ এবং আসকের পর্যবেক্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আইনি নিপীড়নের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক ধারায় পৌঁছেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য জানার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি হলেও, চলতি বছরে গণমাধ্যমকর্মীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকরা রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, যা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করেছে।
তথ্যমতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা নির্যাতন, হয়রানি বা হুমকির শিকার হন অন্তত ২৩ জন। প্রাণনাশের হুমকি পান ২০ সাংবাদিক। প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতকে কেন্দ্র করে মামলার সম্মুখীন হন কমপক্ষে ১২৩ জন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরাসরি হামলার শিকার হন ১১৮ সাংবাদিক। এ সময়কালে দুর্বৃত্তদের দ্বারা হত্যার শিকার হন তিন জন এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রহস্যজনকভাবে চার জন সাংবাদিকের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনা একটা অনিশ্চিত, অস্বস্তিকর ও ভীতিকর পরিবেশের ধারণা দেয়। এটা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অগ্রাধিকারের বিষয়। এর একটিই উপায় তা হলো- দেশকে স্বাভাবিক করা, আইনের শাসনকে ত্বরান্বিত করা। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে পারে, জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
২০২৬ সাল সেই সম্ভাবনার কথাই জানাচ্ছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন সম্পন্ন করে একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। দেশের মানুষ সে দিকেই চেয়ে আছে।