প্রতারণা । সালাম হাসেমী
রাত ১১টা। শশীকনা তার টাচ মোবাইল হাতে নিয়ে শুয়ে শুয়ে তার তা দেখছে। হঠাৎ তার মোবাইলে একটা ভিডিও কল আসলো। সে রিসিভ করল। স্ক্রিনে রূপকের ছবি ভেসে উঠল। এবার সে মোবাইলের সাউন্ড বাড়িয়ে দিল। ওপার থেকে বলে উঠল,
-হ্যালো, কেমন আছো?
-ভালো। তুমি কেমন আছো?
-সৃষ্টিকর্তার রহমতে ভালোই আছি।
-তুমি দেশে ফিরে আসবে কবে?
-আগামী পরশু রাত ১২টায় ঢাকা শাহাজালাল বিমান বন্দরে অবতরণ করব।
-আমরা ওই দিন তোমাকে বিমান বন্দরে রিসিভ করার জন্য রেডি থাকব। থ্যাংক ইউ। গুড নাইট।
দীর্ঘ দশ বছর পর শশীকনার ভালোবাসার মানুষ ইতালি থেকে বাড়ি আসছে। এ খবর শুনে তার আনন্দ আর ধরছে না। সে সাউন্ড বক্সে মিউজিক ছেড়ে দিয়ে কিছু সময় নাচল। শরীর ক্লান্ত হয়ে আসলে মিউজিক বন্ধ করে, মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ দেখার পরে তা বন্ধ করে ঘুমানোর জন্য এবার শুয়ে পড়ল। খুশিতে আজ রাতে তার ঘুম আসছে না।
রূপক ইতালি যাওয়ার পর ফোন করে কয়েক দিন বলেছে শশীকনাকে সে ইতালির নাগরিক করবে, তার পরে এক সময় বিয়ে করে তাকে ইতালি নিয়ে আসবে। তাই শশীকনা শুয়ে শুয়ে ভাবল, এবার রূপক দেশে এসে তাকে বিয়ে করে ইতালি নিয়ে যাবে। এ কথা ভাবতে ভাবতে তার মনের নদীতে মহা খুশির ঢেউ বয়ে গেল। এ সব কথা ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের ঘোরে সে স্বপ্নে দেখল রূপক দেশে ফিরে এসেছে। তার সাথে শশীকনার বিয়ে হচ্ছে। বিয়ের দিন আত্মীয় স্বজন তার বান্ধবী ও পাড়া প্রাতিবেশীরা মহাআনন্দে মেতে উঠেছে। বাসর রাতে রূপক তাকে বলছে বিয়ের পাঁচ দিন পরে তারা কক্সবাজার হানিমুনে যাবে। বাংলাদেশে রূপক তিন মাস থাকবে। এ তিন মাস শশীকনাকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়াবে।
ঠিক সে মুহূর্তে তার বড় ভাবী তার গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে বলল, ‘উঠো শশীকণা। বেলা দশটা বাজে। আর কত ঘুমাবে?’ চোখ মেলে তাকিয়ে তার ভাবীকে বলল, ‘দূর ভাবী। মিষ্টি একটি স্বপ্ন দেখছিলাম, এ সময় এসে ডাক দিয়ে স্বপ্নের মজাটাই নষ্ট করে দিলে।’ ভাবী শশীকনার কথার জবাবে বলল,‘আমাদের আদরের ননদিনী প্রতিদিন রাতে ঘুমের ঘোরে রূপ কথার রাজ্যে চলে যায়। আর সেখানে রাজ পুত্তরের হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়। সে যাই হউক। এসো সকালের নাস্তা করে যাও। ’
শশীকনা সকালের নাস্তা করে সুন্দর করে ঘর ঝাড়ূ দিয়ে তার ঘর সাজানোর জন্য ফুল ও রঙিন কাগজ এনে ঘর সাজাল। তারপর মাঝি-বাড়ি গিয়ে দিন চুক্তি নৌকা ভাড়া করে এল। রূপক দেশের বাড়ি এলে তাকে নিয়ে বর্ষার বিলের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে। যথাসময় রূপকের দেশে ফিরে আসার দিন ঘনিয়ে এল। সন্ধ্যার একটু আগে রূপকের ভাগিনা ইমন মাইক্রোগাড়ি নিয়ে শশীকনার বাড়ির পাশে গাড়ি এনে থামাল। আগে থেকেই রূপকের বাড়ির লোকেরা জানতো যে তাদের মধ্যে দীর্ঘ দিনের প্রেম রয়েছে। রূপক দেশে ফিরে এলে তাদের সাথে বিয়ে হবে। যে কারণে রূপকের মা শশীকনাকে বিয়ের আগে থেকেই বউ বলে ডাকে। কারণ শশীকনার আচার ব্যবহার রূপকদের পরিবারের লোকের পছন্দ হয়েছে রূপকদের বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান, আনন্দ উৎসব হলে শশীকনাকে রূপকের মা দাওয়াত করে বেড়াতে নেয়।
এছাড়া অনুষ্ঠান ছাড়াও মাঝে মাঝে শশীকনাকে রূপকের মা বেড়াতে নেয় এবং উপহারও দেয়। রূপককে রিসিভশনের গাড়ি ঢাকা শাহাজালাল বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে ছাড়ল। শশীকনা গাড়ির একেবারে পিছনে বসে সামনের সকলকে বলল যে, তাকে সবাই যেন আড়াল করে রাখে যেন কেউ গাড়ির সামনে থেকে দেখতে না পায়। তার কথা মত গাড়ির সকল যাত্রী তাকে আড়াল করে রাখল। গাড়ি রাত সাড়ে এগারোটার সময় বিমান বন্দর এলাাকায় পৌঁছালো। যথাসময় বিমান এসে বিমান বন্দরে অবতরণ করল। রূপক এবং তার সাখে এক জন বিদেশী মহিলা ও দুজন বাচ্চা ছেলে গাড়িতে উঠে বসল। বাচ্চা দুজনের বড়জনের বয়স আনুমানিক ছয় বছর এবয় ছ্টোজনের বয়স চার বছর হবে। গাড়িতে উঠার সাথে সাথে ড্রাইভার গাড়ির লাইট বন্ধ করে দিয়ে ফ্যান চালিয়ে দিল। গাড়ি বিমান বন্দর হতে রূপকদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। গাড়ি গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে চলছে। গাড়িতে ‘গ্রাম ছাড়া এই রাঙা মাটির পথ’ গান বাজছে। সবার কাছে ভালোই লাগছে। গান শুনে সবার চোখে সবুজ গ্রাম বাংলার ছবি ভেসে উঠল কল্পনায়। সবাই গানের সুরে মগ্ন হয়ে গেছে। রাত চারটার সময় গাড়ি রূপকদের বাড়িতে এসে পৌঁছালো। সবাই গাড়ি থেকে নেমে রূপকদের বাড়ির উঠানে গিয়ে দাঁড়াল। মালপত্র নামছে। সবাই নামার পরে শশীকনা নেমে এসে সকলের পিছনে দাঁড়াল। তখন রূপকের মা রূপককে প্রশ্ন করল,
-রূপক, তোমার সাথে একজন মহিলা ও দুটি বাচ্চা ছেলে এসেছে, এরা কারা। এদের তো চিনলাম না ?
- (কিছুক্ষণ চুপ থেকে ) মহিলাটি আমার স্ত্রী আর বাচ্চা দুটি আমার ঔরশজাত সন্তান।
এ কথা বলা শেষ হলে সকলের পিছুনে দণ্ডায়মান শশীকনা মাথা ঘুরে হঠাৎ করে পড়ে গেল। সকলে তাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে খাটে শুইয়ে দিয়ে মাথায় পানি ঢালতে লাগল। দশ মিনিট মাথায় পানি ঢালার পরে শশীকনার জ্ঞান ফিরে এল। জ্ঞান ফিরে এলে সে চারদিক তাকিয়ে দেখে, মাথায় পানি দিতে নিষেধ করে আবার চোখ বুঁজে শুয়ে থাকলো। রূপকের মা সকলকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে, দুধ গরম করে আনল। রূপকের মা তাকে ধীরে ধীরে গরম দুধ খাওয়াল। কিছুটা সুস্থবোধ করলে সে রূপকের ভাগিনা ইমনকে ডাকল। ইমন এলে সে তাকে বলল, ‘আমাকে বাড়ি পৌছে দাও।’ যে মাইক্রোটি ভাড়া করে ঢাকা থেকে এসেছিল, সেই গাড়ি ্ইমন ডেকে এনে তাতে করে করে শশীকনাকে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিল। শশীকনা তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে সে কল্পনায় অতীত জীবনে ফিরে গেল। এসএসসি পাস করে সে শহরের নামকরা কলেজে ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিন ক্লাস করার জন্য কলেজে গিয়েছে। সে কলেজে গিয়ে বুঝতে পারল কলেজের ক্লাস স্কুলের ক্লাসের মত না। স্কুলে যেমন নির্দিষ্ট কক্ষে ক্লাস করতে হয়। কলেজে তেমন নয়। কলেজে প্রত্যেক সাবজেক্ট এর ক্লাস বিভিন্ন রুমে করতে হয়। কোথায় ক্লাস হবে তা তার রুটিনের খাতায় তোলার জন্য নোটিশ বোর্ডের কাছে গিয়ে দেখল ছেলেরা নোটিশ বোর্ড ঘিরে রেখেছে। কিন্তু নোটিশ বোর্ডের কাছেও যাওয়ার কায়দা নেই। শশীকনা অদূরে দাঁড়িয়ে দেখল লম্বা মাঝারি গঠনের একটি ছেলে সবার ভিতর দিয়ে ঠেলে নোটিশ বোর্ডের কাছে গিয়ে রুটিন তুলে আনল। শশীকনা ওই ছেলেটিকে বলল,
- তোমার রুটিনটা একটু দেবে কি তুলে নেয়ার জন্য।
- নাও।
রুটিন তোলা শেষ হলে রুটিনের খাতাটি যুবকটিকে ফেরত দিয়ে বলল,
- তোমার নামটি কি জানা যাবে?
-রূপক। আর তোমার নামটি কি তা কি জানা যাবে?
- শশীকনা। প্রথম ক্লাস ইংরেজি। ১১০ নম্বর রুমে। ১১০ নম্বর রুম কোথায়?
- এসো আমার সাথে।
শশীকনা রূপকের পিছু পিছু হেঁটে ১১০ নম্বর রুমে গিয়ে দুজনে মুখোমুখি বসল। এভাবে ওরা দুজনে এক সাথে ক্লাস করে। কলেজের বাবলা তলায় বসে বাদাম তলায় বসে সময় কাটায়। এভাবে এক সাথে চলতে চলতে তাদের মধ্যে মন দেয়া নেয়া হয়। উভয় উভয়কে ভালোবাসে। ওরা এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়। অনার্স পাস করে রূপক চলে যায় ইতালিতে। ইতালিতে যাওয়ার পূর্বে রূপক শশীকনার হাতে হাত রেখে শপথ করে বলেছিল তাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। ইতালি থাকাকালীন সময় শশীকনাকে সে ইকালির নাগরিক করবে। ইতালি থেকে ফিরে এসে তাকে বিয়ে করে ইতালি নিয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত তার ফল দেখা গেল প্রতারণা। রূপক ইতালি গিয়ে বাংলাদেশের বংশো™ূ¢ত এক ইতালি মেয়েেেক বিয়ে করে ঘর সংসার করছে কিন্তু শশীকনাকে তার কিছুই জানায়নি করেনি। তাকে মোবাইল ফোনে ভরসা দিয়ে রেখেছে যে, দেশে ফিরে এসে তাকে বিয়ে করে ইতালি নিয়ে যাবে। অথচ আজ রূপক ইতালি থেকে ফিরে এলে দেখা গেল, সে ইতালি হতে বিয়ে করে দুটি ছেলে সন্তান সহ স্ত্রী নিয়ে দেশে ফিরেছে। রূপক শশীকনার সাথে প্রতারণা করেছে। যা শশীকনা সহ্য করতে পারছে না। হঠাৎ শশীকনার ভাবী তার রুমে এসে ডাক দিলে শশীকনার কল্পনায় ছেদ পরে। তার ভাবী তাকে যা কিছু জিজ্ঞেস করে সে তার কোন ্প্রশ্নের উত্তর দেয় না। নীরবে বসে থাকে। ভাবী রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ওদিকে শশীকনার স্বপ্নরা হাওয়ায় ডানা মেলে উড়ে যায় সুদূরে।