সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬

বিনামূল্যে নিরাপদ পানি নিশ্চিতের তাগিদ উচ্চ আদালতের

সোনার দেশ ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন
বিনামূল্যে নিরাপদ পানি নিশ্চিতের তাগিদ উচ্চ আদালতের

বিনামূল্যে নিরাপদ খাবার পানিকে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সংবিধান অনুসারে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের দেওয়া এই রায়ের ১৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ এবং বিশুদ্ধ পানযোগ্য পানি পাওয়া একটি মৌলিক অধিকার এবং এই পানির অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।


আদালতের এই রায় সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে-যখন নিরাপদ পানি সারা দেশেই ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। অথচ পানি ব্যবস্থাপনায় মানুষের এই মৌলিক অধিকার সুরক্ষার টেকসই কোনো পদক্ষেপ লক্ষণীয় নয়। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখনই গৃহীত না হলে ভবিষ্যতে সমস্যাকে আরো গভীর করে তুলবে। উচ্চ আদালত সরকারের করণীয় বিষয়েও সময় বেধে দিয়েছেন। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিনামূল্যে, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ এবং অন্য ক্ষেত্রে পানযোগ্য পানি সাশ্রয়ী মূল্যে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে সমস্ত পাবলিক প্লেসে নিরাপদ, বিনামূল্যে সরবরাহে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেই মর্মে একটি রিপোর্ট সরকারকে আদালতে দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।


আমরা জানি, নিরাপদ পানির অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার, যা পর্যাপ্ত, নিরাপদ, গ্রহণযোগ্য, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, যা জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। দেশের সংবিধান এই অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এর করণীয়গুলো চিহ্নিত করে মেয়াদভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপের দাবি রাখে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি ফুটিয়ে বা পরিশোধন করে পান করা, পানির অপচয় রোধ করা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করাÑএসব কথা বহুপূর্ব থেকেই বলা হচ্ছে। কিন্তু এসব করণীয়র সামাজিকিকরণের জন্য টেকসই কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। অথচ সুস্থ জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য এটি অপরিহার্য।


পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া কোন জীব বাঁচতে পারে না। মানব দেহের ৬৮ ভাগ পানি। পৃথিবীতে পানির পরিমাণও নির্দিষ্ট। পৃথিবীর ৭০ভাগ জল আর ৩০ভাগ স্থল। পৃথিবীতে প্রাপ্ত পানির ৯৭% লোনা যা ব্যবহার অনুপযোগী। ৩% মৃদু বা স্বাদু পানি। মৃদু পানির ৯৭% হিমবাহ ও বরফাকারে বিরাজমান। অবশিষ্ট ৩% বৃষ্টি, নদী, খাল বিলে প্রবাহমান অবস্থায় থাকে যা আমরা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করি। অর্থাৎ পৃথিবীর মোট পানির খুব সামান্যই আমরা ব্যবহারের সুযোগ পাই।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে পানিতে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্যাথজেন বা জীবাণু থাকে না সে রকম পানি হল নিরাপদ পানি। এছাড়াও নিরাপদ পানিতে আর্সেনিক বা লৌহসহ অন্যান্য খনিজ উপাদান সহনীয় মাত্রায় থাকে। 


দেশে পানিবাহিত রোগের আধিক্যই বেশি। ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, কৃমি, জন্ডিস, হেপাটাইটিস, চর্ম রোগ ও আর্সেনিকোসিস ইত্যাদির মত রোগগুলো পানিদূষণের মাধ্যমে ছড়ায়। এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য অতি উদ্বেগজনক। যে কারণেই মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সুস্বাস্থ্যের জন্যই অপরিহার্য। আর এই অধিকার সুরক্ষিত করার নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। উচ্চ আদালত সেই অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই সবিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। এটা যেন কোনোভাবেই উপেক্ষিত না হয় এবং পদক্ষেপগুলো যাতে খুবই স্পষ্ট ও সহজ হয়- যাতে করে দেশের মানুষ ওইসব পদক্ষেপের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে।