সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

চিনের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন শুরু চান স্টারমার, চোখ অর্থনৈতিক অর্জনে

সোনার দেশ ডেস্ক ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০২:২১ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০২:২১ অপরাহ্ন
চিনের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন শুরু চান স্টারমার, চোখ অর্থনৈতিক অর্জনে
দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যুক্তরাজ্যকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবি: রয়টার্স

প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে ‘পরিশীলিত সম্পর্ক’ গড়ে তুলতে চান বলে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বলেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

চিন সফরে যাওয়া স্টারমার বৃহস্পতিবার জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন। তার এ বার্তাকে বহু বছরের তিক্ততার পর সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত বিবেচনা করা হচ্ছে।

আট বছরের মধ্যে এটাই কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চিন সফর। চারদিনের এ সফরে স্টারমারের জন্য বৃহস্পতিবারই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন তিনি বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শি-র সঙ্গে বৈঠক করেন, এরপর তারা একসঙ্গে দুপুরের খাবারও খান বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

স্টারমারের মধ্য-বাম লেবার পার্টির সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা এখনও পূরণ করতে পারেনি। যে কারণে বেইজিংয়ের গুপ্তচরবৃত্তি বা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যত সন্দেহ ও উদ্বেগই থাকুক না কেন, তাদেরকে এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার দিকে মনোযোগী হতে হচ্ছে।

“বিশ্বমঞ্চে চিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, এ কারণেই যেখানে যেখানে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ খুঁজে পাব আমরা সেখানে আরও পরিশীলিত সম্পর্ক গড়ে তোলা আমাদের জন্য অত্যন্ত ‍গুরুত্বপূর্ণ, অবশ্যই যেসব ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে সেখানে কার্যকর সংলাপেরও সুযোগ রাখতে হবে,” বৈঠকের শুরুতেই শি-কে এমনটাই বলেছেন স্টারমার।

শি বলেছেন, ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক ‘উত্থান-পতনের’ মধ্য দিয়ে গেছে, যা কোনো দেশের জনগণেরই কল্যাণে আসেনি। এখন চিন তাদের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রস্তুত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ও অস্থির ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপে চিন্তিত ইউরোপীয় নেতারা সম্প্রতি তাদের পুরনো মিত্র ওয়াশিংটনকে খানিকটা দূরে সরিয়ে রেখে চিনের পথে ছুটছেন। স্টারমার এ তালিকায় আপাতত সর্বশেষ ব্যক্তি, ‍যিনি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

এর কিছুদিন আগেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও চিন সফর করে গেছেন। তার সফরকালে বাণিজ্যে বাধা সরিয়ে নিতে অটোয়া ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তিও হয়েছে, যা ট্রাম্পকে রুষ্ট করেছে।

ব্রিটেনের আগের রক্ষণশীল সরকারের আমলে চিনের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ খারাপ হয়। সেসময় লন্ডন জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অজুহাত ও হংকংয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতায় বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপকে কারণ দেখিয়ে যুক্তরাজ্যে চিনের অনেক বিনিয়োগ ছেঁটে ফেলেছিল।

“সরকার গঠনের সময় ১৮ মাস আগে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, ব্রিটেনকে আমি ফের বাইরের দিকে মনোযোগী করাবো। কারণ আমরা সবাই জানি, বাইরের অনেক ঘটনাই আমাদের সুপারমার্কেটের তাকে থাকা পণ্যের দাম থেকে শুরু করে আমাদের নিরাপত্তা অনুভূতিসহ অনেক কিছুর ওপর প্রভাব ফেলে,” শি-কে বলেন স্টারমার।

যুক্তরাজ্যের বিরোধীদল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেডেনক বুধবার বলেছেন, চিন যে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে তার কারণে তিনি দেশটি সফর করতেন না।

ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বলছে, চিন নিয়মিতই যুক্তরাজ্য সরকারের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালায়। চিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

দুই দেশ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে তার সঙ্কেতস্বরূপ স্টারমার-শি অবৈধ অভিবাসী পাচারে জড়িত অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চিন-যুক্তরাজ্যের যৌথ কর্মকাণ্ডের ঘোষণা দিতে পারেন বলে জানিয়েছে ডাউনিং স্ট্রিট।

ইউরোপের বিভিন্ন অংশে শরণার্থী হতে চাওয়া লোকজনকে নিয়ে যাওয়া ছোট নৌকাগুলোতে চিনে বানানো ইঞ্জিনের ব্যবহার কমানো যায় সে বিষয়ে এ চুক্তিতে মনোযোগ দেওয়া হবে।

পাচারকারীদের লোকজন নিয়ে যাওয়ার পথ শনাক্তে একে অপরের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করে নেবেন ব্রিটিশ ও চিনা কর্মকর্তারা। তারা বৈধ ব্যবসাকে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র যেন অবৈধ কাজে ব্যবহার করতে না পারে তা নিয়ে চিনা উৎপাদকদের সঙ্গেও কাজ করবেন, বলেছে ডাউনিং স্ট্রিট।

ডিসেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তাজনিত অপরাধে দণ্ডিত হংকংয়ের সাবেক মিডিয়া টাইকুন ও ব্রিটিশ নাগরিক জিমি লাইয়ের প্রসঙ্গ শি-র সঙ্গে বৈঠকে তুলবেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে স্টারমার চিনগামী তার বিমানে থাকা সাংবাদিকদের বলেন, তিনি মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ‘যা যা আলাপ করা দরকার’ তা করবেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে তার সঙ্গ হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যবসায়িক নেতা; স্টারমারের সফরসূচিও বলছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার দিকেই তার মনোযোগ সবচেয়ে বেশি।

বুধবার চিনে নামার কয়েক ঘণ্টা পরই এক ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলকে তিনি বলেছেন, “এখন সময় চিনের সঙ্গে পরিপক্ক সম্পর্ক গড়ে তোলার।”

এরপর তিনি এক চীনা রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খান, যেখানে ২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী জ্যানেলে ইয়েলেনও খেয়েছিলেন।

রেস্তোরাঁর কর্মীদের সঙ্গে ছবি তোলার সময় তিনি চীনা ভাষায় ধন্যবাদ ‘শিয়ে শিয়ে’ কীভাবে উচ্চারণ করা যাবে তা নিয়ে আলোচনাও করেন বলে উইবুতে পোস্ট করা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের চাইনিজ স্টাডিজের অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলছেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে অগ্রগতি হচ্ছে তা বোঝাতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও চিন একাধিক চুক্তির ঘোষণা দিতে যাচ্ছে বলেই তার ধারণা।

“এ সফরকে অবশ্যই সফল দেখাতে হবে। উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য যে, তারা এমন কোনো বৈঠক চাইবে না যেখানে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ আছে তা নিয়ে কেবল তর্কই হবে,” বলেছেন তিনি।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ