সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

রিলস বা টিকটকে আসক্তি নয়, কিশোররা ব্যস্ত বিদ্যুৎ ও রোবট বানাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:০০ পূর্বাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:০০ পূর্বাহ্ন
রিলস বা টিকটকে আসক্তি নয়, কিশোররা ব্যস্ত বিদ্যুৎ ও রোবট বানাতে

যখন বিশ্বজুড়ে অভিভাবকদের বড় দুশ্চিন্তার নাম কিশোরদের স্ক্রিন আসক্তি বা রিলস-টিকটকের মোহ, ঠিক তখনই রাজশাহীর একদল কিশোর দেখাচ্ছে ভিন্ন স্বপ্ন। ভার্চুয়াল জগতের রঙিন পর্দার বাইরে এসে তারা মেতেছে বাস্তব পৃথিবীর সমস্যা সমাধানের নেশায়। তাদের ভাবনায় নেই কোনো ভাইরাল ট্রেন্ড, আছে দূষিত পানি শোধন, বায়ুদূষণ রোধ কিংবা ২০৫০ সালের জলবায়ু মোকাবিলার মতো গুরুগম্ভীর সব চ্যালেঞ্জ।


বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) থেকে রাজশাহী বিজ্ঞান ও শিল্পপ্রযুক্তি মেলার প্রাঙ্গণে গেলে শোনা যাচ্ছে এমনই সব উদ্ভাবনী গল্পের গুঞ্জন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), রাজশাহীর উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই মেলা প্রমাণ করছে, সুযোগ পেলে খুদে বিজ্ঞানীরাও বদলে দিতে পারে চেনা জগৎ।


মেলার একটি স্টলের সামনে জটলা। সেখানে সপ্তম শ্রেণির চার শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের রাইয়ান ইয়াজধানী, আতিকুজ্জামান, তানজিম ইশান রেজা ও সানজিদ আল সীমান্ত, দর্শনার্থীদের বোঝাচ্ছে তাদের ‘ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট অ্যান্ড ওয়াটার ডিসপেনসার’ প্রকল্পের খুঁটিনাটি। তাদের ভাষ্য, দেশের নদীবাহিত ও শিল্পঘন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দূষিত পানিকে পানের উপযোগী করা সম্ভব।


 শুধু পানি নয়, রাজশাহীর বাতাস নিয়েও ভাবছে কিশোররা। সৃষ্টি সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির আব্দুল্লাহ আল রাফি, হিজবুল হাসান ও মো. শাহরিয়ার মাহমুদ নিয়ে এসেছে ‘এয়ার পলিউশন রিমুভার যন্ত্র’। তারা জানায়, শহরে বেড়ে চলা বায়ুদূষণ রোধে তাদের যন্ত্রটি বাতাস থেকে ক্ষতিকর কণা টেনে নিয়ে পরিবেশকে বিশুদ্ধ করতে সহায়তা করবে।


 উদ্ভাবনের নেশায় পিছিয়ে নেই শহীদ মামুন মাহমুদ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরাও। মো. মোহাইমিন বিন ইসলাম ও মুশফিকুর রহমান মাহিন প্রদর্শন করছে ‘হাইড্রোলিক ইলেকট্রিসিটি’ প্রজেক্ট। তাদের উদ্ভাবনটি স্থির জলাধারের পানিকে গতিশীল করে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম।


 সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ভাবনার পরিচয় দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের তিন শিক্ষার্থী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের অনেক অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা তৈরি করেছে ‘মডার্ন ফ্লোটিং আরবানাইজেশন সিস্টেম’ যাতে সেই কঠিন বাস্তবতায় মানুষ ভাসমান শহরে বসবাস করতে পারে।


মেলায় আসা শিক্ষার্থীদের এই উদ্ভাবনী স্পৃহা যেন প্রধান অতিথির বক্তব্যেরই বাস্তব প্রতিফলন। মেলা উদ্বোধনকালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের সদস্য (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) ড. হোসনে আরা বেগম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন, যা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


 তিনি বলেন, মোবাইল ফোন তোমাদের প্রিয়, কিন্তু কখনো ভেবেছ, এর ভেতরে কী বিজ্ঞান কাজ করে? শুধু স্ক্রল করলেই চলবে না, এর পেছনের বিজ্ঞান জানতে হবে। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হবে না, এর পেছনের বিজ্ঞান জানার আগ্রহ তৈরি করতে হবে।


 বিজ্ঞান কঠিন এই ধারণাকে ভুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো শুরু করা ও নিয়মিত চর্চা। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মেধার ঘাটতি নেই, প্রয়োজন শুধু আত্মবিশ্বাস, আগ্রহ, দলগতভাবে কাজ করা এবং মনোযোগ ও শৃঙ্খলা। 


অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিএসআইআর রাজশাহী গবেষণাগারের পরিচালক হাবিবুর রহমান ভূঁঞা। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের মাঝে বিজ্ঞান চিন্তার মাধ্যমে নতুন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগ্রহ সৃষ্টি করাই এ মেলার প্রকৃত উদ্দেশ্য। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. মো. শাহ জামাল টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে খুদে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রুহুল আমিন।


 আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এবারের মেলায় রাজশাহী অঞ্চলের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মোট ৫১টি স্টল রয়েছে। শিক্ষার্থীরা তিনটি বিভাগে (ষষ্ঠ-অষ্টম, নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ) অংশ নিয়েছে। ৩১ জানুয়ারি মেলার শেষ দিনে স্টল মূল্যায়নের মাধ্যমে বিজয়ীদের বিশেষ পুরস্কার ও সব অংশগ্রহণকারীকে সনদ দেয়া হবে। মেলা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত।


উদ্বোধনের পর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় বাড়তে থাকে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ঘুরে দেখছে প্রজেক্ট, প্রশ্ন করছে এবং শুনছে একে অপরের উদ্ভাবনের গল্প; যে গল্পে নেই কোনো টিকটক, আছে আগামীর বিজ্ঞান।


মাহী