মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

নির্বাচনি আমেজ নগর থেকে গ্রামে

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন
নির্বাচনি আমেজ নগর থেকে গ্রামে

রাজশাহীর ছয়টি আসনে নগর ছাড়িয়ে গ্রামের মেঠোপথেও নির্বাচনি আমেজ পৌছে গেছে। গেল জানুয়ারির মাসের ২২ তারিখ থেকে প্রচারণা শুরু হলেও রাজশাহীতে চলছিল ঢিমেতালে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসায় প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচারে মুখর হয়ে থাকছে কৃষকের উঠান থেকে গ্রামীণ হাট-বাজার। এমনকি শহরের মোড়, অলিগলি থেকে চায়ের দোকানও। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও জোরতাল প্রচারে রয়েছেন শুধু বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা।


কাগুজে পোস্টার ও প্লাস্টিকের ব্যানার-ফেস্টুন  না থাকলেও কাপড়ের ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সব যায়গা। সাদা কাপড়ে কালো অক্ষরে লেখা ব্যানার-ফেস্টুনে শোভা পাচ্ছে ভোটের মাঠ। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কানে বিঁধছে ভোটের মাইকিং। গানে গানে প্রার্থীদের পক্ষে ভোট প্রার্থনা অনেকের বিরক্তির কারণ হলেও ভোটের উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।


ভোটের মাঠে প্রার্থীদের মুখে মুখে যেমন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফুটছে, তেমনভাবেই লঙ্ঘিত হচ্ছে আচরণবিধি। ইতোমধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের বেশির ভাগ প্রার্থী। তাদের আদালতে তলবও করা হয়েছে। তবুও অনেকেই প্রচারের ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছেন। কেউ গাছে ফেস্টুন লাগিয়ে শোকজ হচ্ছেন, আবার কেউ সরকারি স্থাপনা ব্যবহার করে আচরণবিধি ভাঙছেন। ভোটের মাঠে এখন সবচেয়ে বেশি প্রার্থীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। নির্বাচিত হলে কী কী করবেন আর কী কী করবেন নাÑতার বয়ান চলছে ভোটের মাঠে ও জনসংযোগে। প্রচারণায় গিয়ে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি লোভনীয় সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।


রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে ৩০ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২৬ জনই দলীয় প্রার্থী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন চার জন। দলীয় প্রার্থীদের নিজ নিজ দলের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সংরক্ষিত অন্য প্রতীক পেয়েছেন। তার মধ্যে রাজশাহী-১ আসনে চার জন, রাজশাহী-২ আসনে ছয় জন, রাজশাহী-৩ আসনে পাঁচ জন, রাজশাহী-৪ আসনে চার জন, রাজশাহী-৫ আসনে সাত জন ও রাজশাহী-৬ আসনে চার জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।


রাজশাহী-১ আসনে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন বিভিন্ন দলের চার জন। এর মধ্যে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে বিএনপির শরীফ উদ্দিন, জামায়াতের অধ্যাপক মজিবুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের মো. শাহজাহান (ট্রাক), আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আবদুর রহমান (ঈগল)। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯, নারী ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৭৭ ও হিজড়া তিন জন।


রাজশাহী-২ (সদর) আসনে লড়ছেন ছয় জন। এর মধ্যে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু, জামায়াতের ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, আমার বাংলাদেশ পার্টির মু.সাঈদ নোমান, নাগরিক ঐক্যের মোহাম্মদ সামছুল আলম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মেজবাউল ইসলাম ও স্বতন্ত্র সালেহ আহমেদ। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৫১, নারী ১ লাখ ৯১ হাজার ৩০৫ ও হিজড়া আট জন। স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহমেদ নিয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক।


রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে লড়ছেন পাঁচ জন। এর মধ্যে বিএনপির শফিকুল হক মিলন, জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় পার্টির আফজাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান ও আমজনতার দলের সাইদ পারভেজ। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৯৯ জন। পুরুষ ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৬, নারী ২ লাখ ১২ হাজার ৩০৭ ও হিজড়া ভোটার ছয় জন।


রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে লড়ছেন চার জন। তারা হলেন- বিএনপির ডি.এম.ডি জিয়াউর রহমান, জামায়াতের আবদুল বারী সরদার, জাতীয় পার্টির ফজলুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তাজুল ইসলাম খান। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৩৫, নারী ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৬ ও হিজড়া চার জন।


রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে লড়ছেন সাত জন। তারা হলেন বিএনপির নজরুল ইসলাম, জামায়াতের মনজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রুহুল আমিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আলতাফ হোসেন মোল্লা, স্বতন্ত্র ইসফা খায়রুল হক, স্বতন্ত্র রায়হান কাওসার ও স্বতন্ত্র রেজাউল করিম। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৮, নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ ও হিজড়া পাঁচ জন।


আসনটিতে বিএনপির দুই জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। একই আসনে যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি রেজাউল করিম পেয়েছেন ফুটবল প্রতীক। আসনটিতে রায়হান কাওসার নামে আরেকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত রায়হান কাওসার এবার পেয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক।


রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনে লড়ছেন চার জন। তারা হলেন বিএনপির আবু সাইদ চাঁদ, জামায়াতের নাজমুল হক, জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুস সালাম সুরুজ। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৮, নারী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৩ ও হিজড়া দুজন।


রাজশাহীর সবকটি আসনেই ভোটের প্রচারে মাঠে এখন উৎসবের আমেজ। সকাল হলেই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে প্রার্থীদের জনসংযোগ ও ছোট ছোট মিছিলে উৎসবের রূপ নিচ্ছে ভোটের মাঠ। দুপুরের পর মাইকের আওয়াজে মুখরিত হচ্ছে শহর থেকে গ্রাম। আসনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের প্রচার দেখা গেছে। ইতোমধ্যে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার লাগিয়েছেন প্রার্থীরা। মাইকের আওয়াজ এখন মুখর করে তুলেছে ভোটের মাঠ। দুপুরের পর মাইকে গানে গানে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের শব্দ কানে আসছে। নগরীর ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর ধানের শীষের পক্ষে প্রতিদিন মিছিল বের হচ্ছে।


তানোর উপজেলার মাড়িয়া গ্রামের ভোটাররা বলেন, এখানে বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীই শক্তিশালী। তবে যার মাধ্যমে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের আশা পাওয়া যাবে, তাদের পক্ষেই শেষ পর্যন্ত ভোট দেবেন। শহরের ভোটাররা বলছেন, তারা যোগ্য প্রার্থীদের পক্ষেই থাকবেন। সব মিলিয়ে রাজশাহীর সংসদীয় ছয়টি আসনেই এখন তুঙ্গে প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থী ও সমর্থকদের কারও হাতে আর সময় নেই। রাতদিন তাই ভোটের মাঠেই কাটছে তাঁদের সময়। রাজশাহীতে ২৯ জন প্রার্থী থাকলেও মাঠে সোচ্চার রয়েছেন ছয়টি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ১২ জন প্রার্থী। মূলত এদের মধ্যেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস রয়েছে।


গোদাগাড়ী বেসরকারি মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-১ আসনের ভোটার মশিউর রহমান জানান, এবারের নির্বাচনে আমাদের এখানে বিএনপি-জামায়াত সমানতালে অবস্থান করছে। আমার ধারণা এবার এই আসনে লড়াইটা হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত কে জিতে বলা মুশকিল।


রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, বিএনপির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান থাকার কারণে অন্য দল সুযোগ পাবে না। তবে মনোনয়ন নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ ছিল। সেটা কেটে গেছে। এখন আমরা সবাই নির্বাচনি মাঠে একসঙ্গে দলের প্রার্থীর জন্য কাজ করছি। এতে করে রাজশাহী জেলার সব আসনেই আমাদের ভালো ফলাফল আসবে।


মহানগর জামায়াতের জেনারেল সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, আগে বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। এখন নেই। বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতিবাচক অবস্থানই জামায়াতকে নির্বাচনের মাঠে বাড়তি সুবিধা দেবে। ভোটাররাও তাদের এসব বিরোধ নিয়ে বিরক্ত।