হাসিনা-বিরোধী বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে পুত্র জয়! তুঙ্গে বিতর্ক, কী আছে বইটিতে?
সম্প্রতি অনলাইনে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন একপেশে হতে চলেছে বলে কটাক্ষ করেছেন শেখ হাসিনা পুত্র সাজিদ ওয়াজেদ জয়। কলকাতার সেই ভাষণ অনুষ্ঠানটি ছিল একটি বই প্রকাশের। সেখানে বিএনপি, জামাত, মুহাম্মদ ইউনূসেরও তীব্র সমালোচনা করে আওয়ামি জমানার বেশ কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েও নিজস্ব মূল্যায়ন পেশ করেন তিনি। কিন্তু বিস্ময়ের কথা, সংশ্লিষ্ট বইটি নিয়ে একটি শব্দও শোনা যায়নি তাঁর মুখে। যা নিয়ে জল্পনা ছড়িয়েছে। বইটিতে বাংলাদেশের অতীত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জমানা, হাসিনার আমলের নানা ইস্যু নিয়ে এমন অভিমত, তথ্য রয়েছে যা হাসিনা তনয়ের কাছে অস্বস্তিকর বলেই কি সেটির প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি, প্রশ্ন উঠেছে।
সব থেকে বড় কথা, বইটির নামের মধ্যে ‘সাম্প্রদায়িক গন্ধ’ রয়েছে বলে বাংলাদেশের লেখক-সাধারণ মানুষই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, আওয়ামি লিগের মোড়কে কি তাহলে সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দেওয়া হয়েছে? বইয়ের অন্যতম লেখক (আওয়ামি লিগ ঘনিষ্ঠ) দাবি করেছেন, তিনি ছিলেন সে দেশের শীর্ষ দৈনিকের সাংবাদিক। প্রশ্ন সেখানেও। কোন দৈনিকের? এমনকী, বইটিতে বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা আওয়ামি নেতা আসাদুজ্জামান খান কামালের যে মন্তব্য ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিও বিকৃত হয়েছে বলে তিনি সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে জানিয়েছেন।
আর কী রয়েছে সেই বইয়ে? ৪৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, মুজিবুরের আমলে তাঁকে মহিমান্বিত করে মুক্তিযুদ্ধের অন্য ব্যক্তিত্বদের খাটো করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। মুজিবের পক্ষে অতিরিক্ত প্রচার, হাসিনা জমানার নানা ব্যর্থতা, অপশাসন, দুর্নীতি, বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, বিরোধীদের পরিসর না দেওয়া, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন-সব মিলিয়ে হাসিনা-বিরোধী প্রবল জনমত তৈরি হয়েছে। ইসলামি মৌলবাদীরা যার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙা, জনমানস থেকেই তাঁর স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছে এজন্যই।
বইয়ের ৬১ পাতায় লেখা হয়েছে, হাসিনাই হিন্দুদের একমাত্র ভরসা, আওয়ামি লিগের এই দাবি উড়িয়ে শীর্ষ বিএনপি নেতা, যিনি আবার হিন্দুও, নিতাই রায়চৌধুরির মত, অধিকাংশ হিন্দু-বিরোধী পলিসি গৃহীত হয় আওয়ামি শাসনেই। ২০১৩-য় এনিমি প্রপার্টি অ্যাক্ট বদলে হয় ভেস্টেড প্রপার্টি অ্যাক্ট। এই আইনের অপব্যবহার করে হিন্দু সম্পত্তি দখল করেন আওয়ামি লিগের নেতারা। হাসিনাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দেখানোর রাজনৈতিক ভাষ্য বানানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ‘হিরো’দের তালিকায় এমন প্রচুর নাম ঢোকানো হয়েছে, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে কোনওদিনই ছিলেন না!
বইয়ে রয়েছে বাকশাল পর্বের কথা। ৭৭ নম্বর পাতায় মুজিবের আমলে ১৯৭৪-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গও। এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সেই দুর্ভিক্ষের মতো বড় ক্ষতি আর কিছুতেই হয়নি দেশের। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন এই সংক্রান্ত ইউটিউবের ভিডিওগুলি দেখার। কাতারে কাতারে অনাহারক্লিষ্ট মানুষ সরকারের দুয়ারে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ সেই সরকারের হাতে না আছে অর্থ, না আছে খাদ্যের সংস্থান, না আছে কর্তৃত্ব। আন্তর্জাতিক স্তরেও সুনাম নেই। সেই দৃশ্য ভোলা যাবে না। নয়া উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির জন্য গোটা একটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মাত্র ৩ বছর বাদে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় হয়। কিন্তু অনেক বছর লোকমুখে এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে একটি শব্দও শোনা যায়নি। কেননা বিষয়টি হাসিনা তথা আওয়ামির পক্ষে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর বলে মনে করা হত।
বইয়ের ১২২ পাতায় একটি তথ্যচিত্রের কথা রয়েছে যাতে দেখানো হয়েছে যে, হাসিনা জমানায় প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বেআইনিভাবে হুন্ডি, হাওয়ালা, ব্রিটেনে প্রপার্টি ডিলের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে।
এমন একটি বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে কীভাবে জয় উপস্থিত থাকলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিতর্ক বাড়ায় জয় সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি করেছেন, বইটি না পড়েই নাকি তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি পুরো বিষয়টি নিয়েই অন্ধকারে ছিলেন। যদিও তাতে বিতর্ক কমছে না। বিএনপি-সহ অন্যদের দাবি, এই ঘটনা প্রমাণ করেছে হাসিনা ও জয়ের মধ্যে ক্রমেই দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: সংবাদ প্রতিদিন অনলাইন