সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

বিএনপি দুর্গ উদ্ধার করতে চায়, লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই জামায়াতও

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন
বিএনপি দুর্গ উদ্ধার করতে চায়, লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই জামায়াতও

রাজশাহীর নয়টি উপজেলা ও একটি সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত ছয়টি আসন। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন ও বাগমারা উপজেলা নিয়ে পৃথক দুটি আসন। বাকিগুলোতে দুটি উপজেলা মিলে করা হয়েছে আরও চারটি আসন। মঙ্গলবার সকাল সাতটায় শেষ হবে প্রচারণা। এখন চলছে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ।  


প্রচারণা শেষ হওয়ার আগে প্রার্থীদের পাশাপাশি কর্মি-সমর্থকদের বিরামহীন প্রচার ছিল। আর এতেই জমজমাট ভোটের আমেজ তৈরি হয়। নগর থেকে গ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার আওয়াজ কর্মি-সমর্থকদের মুখে মুখে। এ অঞ্চলে ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বী মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। অন্য দলের প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও তাদের প্রচার তেমন দৃশ্যমান ছিল না। এক্ষেত্রে সমান শক্তি নিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছে বিএনপি-জমায়াতের প্রার্থী ও কর্মি-সমর্থকরা।


শেষ মুহূর্তের প্রচারের পাশাপাশি জয় পরাজয়ের হিসাবও কষছেন দুই দলের নেতাকর্মীরা। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় ক্রমেই জটিল হয়ে পড়েছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বিএনপিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন ভোটাররা। ভোটের ফলাফল কী হবে এ নিয়ে নতুন ভাবনা, নতুন হিসাব শুরু হয়েছে। চলছে আসনভিক্তিক চুলচেরা বিশ্লেষণও। বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। আর মাঝখানে জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখতে পারে নারী, আদিবাসী, তরুণ ও ভাসমান ভোটাররা। 


এক সময় রাজশাহী অঞ্চল বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত থাকলেও গত ১৭ বছরে নানা প্রতিকূলতার কারণে সেই দুর্গ কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে। তবে একই সময়ে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এখন আসনকেন্দ্রিক ভোট বিশ্লেষণে বিএনপি ও জামায়াতের হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে অনেক। 


রাজশাহীর প্রায় সব আসনেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে এক সময়ের শক্ত দুর্গের বিএনপি। কোথাও জামায়াতের সঙ্গে কঠিন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবার কোথাও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কারণে বিএনপির ভোটের হিসাব-নিকাশ জটিল হচ্ছে। যদিও বিএনপির প্রার্থীরা বলছেন, ভোটের মাঠে ধানের শীষেরই জোয়ার বইছে। তবে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী জামায়াতের ভিতও রয়েছে দৃঢ়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের অবস্থান গণনার বাইরেও থাকলেও এবার আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় শক্তিশালী হয়েছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা। এ পরিস্থিতিতে সব দলের প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার প্রবণতা দেখা গেছে।


মাঠপর্যায়ের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই অঞ্চলের ভোটের লড়াই মূলত দ্বিমুখি হতে চলেছে। রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে বর্তমান সমীকরণে তিনটিতে বিএনপি এবং তিনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তবে এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক, নারী ভোটার এবং তরুণ ভোটারদের পছন্দ। এই তিনটি পক্ষ যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়বে, শেষ হাসি তিনিই হাসবেন।


রাজশাহী-১: হারানো আসন উদ্ধার করতে বিএনপি ও জামায়াত

চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৬ সালের রাজশাহী-১ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। এই আসনেও তিনি বেশ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। এবারও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শক্তিশালী বিএনপি প্রার্থী ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে। এই দুই প্রার্থীই তাদের হারানো আসন উদ্ধার করতে চাচ্ছে। 


এই আসনের বড় একটি অংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটার। বিশেষ করে গোদাগাড়ী উপজেলায় তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। জয়ের শেষ হাসি কে হাসবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই বিপুলসংখ্যক ভোটারের সমর্থনের ওপর। বিপুল সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের টানতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই নানা কৌশল অবলম্বন করছে। ইতোমধ্যে জামায়াতের জনসভায় সংখ্যালঘু নেতাদের উপস্থিতি নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসনটি মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সাধারণ ভোটারদের মুখে মুখে ঘুরছে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম। শক্তিশালী দুই প্রার্থী এবার আদিবাসীদের প্রাধান্য দিচ্ছেন ভোটের মাঠে। আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি এবার আদিবাসীদের তাদের ভোটার হিসেবে গণনায় নিলেও জামায়াতও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে দুই উপজেলার আদিবাসীদের।


রাজশাহী-১ আসনে দুটি উপজেলা, ৪টি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৪ জন। নারী ভোটার ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৭ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন। 


রাজশাহী-২: অভিজ্ঞ মিনুকে ছাড় দিতে চান না নবাগত জাহাঙ্গীর

সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রাজশাহী-২ আসন। এই আসনের সাবেক এমপি ছিলেন মিজানুর রহমান মিনু, ছিলেন সিটি করপোরেশনের মেয়রও। বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টাও তিনি। তবে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী করছেন জামায়াতের মহানগরের নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। এই আসনেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রার্থীতা করছেন জামায়াতের প্রার্থী। অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে মিনুর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে এখানে বিএনপির অবস্থান জামায়াতের তুলনায় শক্তিশালী। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরও ৪ প্রার্থী। তবে তারা সেভাবে প্রচারণায় নেই।    


সাংগঠনিক শক্তি ও পরিচিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন মিজানুর রহমান মিনু। তবে তাকে ছাড় দিতে চান না নবাগত ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তবে পরিচিতি ও সংগঠনিক পরিধি বৃদ্ধির নিরিখে তাকে বিএনপি প্রার্থী মিনুর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।


এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৮জন। 


রাজশাহী-৩: চেয়ারম্যান থেকে উঠে আসা আবুল কালাম চ্যালেঞ্জ বিএনপির প্রার্থীর

রাজশাহী মহানগরী ঘিরে আছে পবা উপজেলা। সঙ্গে মোহনপুর উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে রাজশাহী-৩ আসন। পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়নের পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল কালম আজাদ। জামায়াতের এই প্রার্থী একটানা ২৮ বছর ধরে ছিলেন চেয়ারম্যান। টানা পাঁচবার তিনি এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এই প্রার্থীই এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও হেভিওয়েট প্রার্থী শফিকুল হক মিলনকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। তবে প্রচার থেকে জনসংযোগ সব দিকে এগিয়ে বিএনপির এই প্রার্থী। এর আগে ২০১৮ সালে তিনি এই আসনে নির্বাচন করেছিলেন।


এই আসনে আরও ৪জন প্রার্থী আছেন। তবে তারাও প্রচারণা নেই। দুই উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ, তিনটি পৌরসভা আছে। রাজশাহী-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৮৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ৬৯০ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৩ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৬ জন। 


রাজশাহী-৪: বিএনপি ও জামায়াতের ভোটের লড়াইয়ের আভাস

১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪ আসন। এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এখানে দলীয় ভোটের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইমেজ, সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় ইস্যুগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে। এদিক থেকে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় সামাজিক ও চিকিৎসাসেবা মূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ভোটারদের মাঝে তার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। 


বিএনপি প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান সাবেক চেয়ারম্যান হওয়ায় তিনিও উপজেলাজুড়ে সুপরিচিত এবং তার একটি শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন তাকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। এই আসনে দুই প্রার্থীর ভোটের লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। 


এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৬ ৫২১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৪ জন। 


রাজশাহী-৫: বিএনপির মাথাব্যথা বিদ্রোহী, স্বস্তিতে জামায়াতের প্রার্থী

রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী বাদেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আরও দুই নেতা। তবে তাদের দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এই দুই প্রার্থী এখন হয়ে উঠেছেন বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডলের মাথাব্যথা। এই আসনে ত্রিমুখি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা গেছে। ধানের শীষ বাদেও স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের ইসফা খাইরুল হক শিমুলও লড়তে পারেন দুই প্রার্থীর সঙ্গে। তবে ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম এককভাবে দুর্গাপুরের সন্তান হওয়ায় তাকে ঘিরে রয়েছে আলাদা একটা আগ্রহ। যা ভোটের মাঠের হিসাব নিকাশ করতে হচ্ছে আলাদা একটা সমীকরণ। যার কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মনজুর রহমান রয়েছেন স্বস্তিতে। 


এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫০ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার আছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৯ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৭০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৫ জন।  


রাজশাহী-৬: দাড়িপাল্লার চেয়ে এগিয়ে ধানের শীষ       

পদ্মা নদী ঘেরা রাজশাহীর দুই উপজেলা চারঘাট ও বাঘা। এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৬ আসন।  এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন বিএনপি প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদ  ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী নাজমুল হক। তবে এই আসনে এগিয়ে আছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ। আছেন প্রচারণায় এগিয়ে। 


জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হকও নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। দুই প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও ভোটাররা এগিয়ে রাখছেন চাঁদকে। প্রতিশ্রুতিমূলক প্রচারণা ও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগযোগে দুই পক্ষই জিততে চাচ্ছে।


এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯১১ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬৬ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ২জন।