চাঁপাইনবাবগঞ্জে ককটেল বিস্ফোরণে দুইজন নিহত. আহত ৩
চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া গ্রামে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে একটি বসতবাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে নিহতদের মরদেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভোররাতে ওই বাড়িতে একদল যুবক ককটেল তৈরি করছিলেন। তখন হঠাৎ এক বা একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই দুই যুবকের মৃত্যু হয়। বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
স্থানীয়রা জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে নিহত দুজনের মরদেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন এবং মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করা যায়নি। বিস্ফোরণের প্রবল শক্তিতে বাড়িটির টিনের চাল উড়ে যায় এবং ইটের দেয়ালের একটি অংশ সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। স্থানীয়রা তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করেন। তাদের সারা শরীর মারাত্মকভাবে ঝলসে গিয়েছিল।
তবে আহত এক যুবকের পরিবারের দাবি, তাঁদের ছেলে ঘটনাস্থলে পিকনিক করতে গিয়েছিলেন। সেখানে বোমা হামলার কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রাণিহাটি এলাকার জিহাদ ও আল-আমিন। এছাড়া আহত হন সদর উপজেলার ঘোড়াস্ট্যান্ড গ্রামের শুভ (২২), চরবাগডাঙ্গা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন (৩০) ও বজলুর রহমান (২০)। আহত ব্যক্তিদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তিনটি ওয়ার্ডে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, তিনজনেরই মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে। তবে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনটি ওয়ার্ডে রেখে তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, বিস্ফোরণ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ছিল এবং তাৎক্ষণিকভাবে দুইজনের মৃত্যু ঘটে। ঘটনার তীব্রতার কারণে প্রথম দিকে হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ককটেল তৈরির সময় এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলে বিস্ফোরক তৈরির পর্যাপ্ত আলামত পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, যে বাড়িতে বোমা বানানো হচ্ছিল সেটি আংশিক ভেঙে গেছে এবং টিনের চালা উড়ে গেছে। পুলিশের ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বোঝা গেছে যে ককটেল তৈরির কাজ চলছিল। এক বা একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দুইজন মারা যান। সিআইডি তৎক্ষণাৎ আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে।
নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ক্রিমিনালের কোনো পরিচয় থাকে না। ক্রিমিনাল ইজ এ ক্রিমিনাল। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ঘটনাটি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলম জানান, পুলিশ নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং পুরো বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর ওই এলাকায় পুলিশি নজরদারি ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছেন এবং এলাকায় আরও বিস্ফোরক মজুদ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন বিষয়ে বিস্তৃত তদন্ত চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত করতে পুলিশ ও সিআইডি তৎপর রয়েছে। স্থানীয়দের সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসাধীন শুভর মা ফৌজিয়া খাতুন বলেন, তার ছেলে ট্রাক্টর চালান এবং নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। পিকনিক আছে জানিয়ে রাত ১০টার দিকে শুভ বাড়ি থেকে বের হন। প্রথমে শরীর খারাপ বলে বের হতে না চাইলেও বারবার ফোন আসার কারণে শুভ যান। পিকনিকে বোমা হামলার কারণে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। শুভকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি খবর পান। এরপর হাসপাতালে আসেন। বিস্তারিত জানেন না।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এই বাড়িতে কোনো পিকনিক ছিল না। এটা কোনো পিকনিকে হামলা নয়। তারা বোমা তৈরি করছিলেন। তখন বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে প্রাচীর ভেঙে গেছে। ঘরের টিন উড়ে গেছে। এমন শক্তিশালী বিস্ফোরণ বোমা তৈরির সময় হয়।’ ডিআইজি শাহজাহান বলেন, সকালে খবর পেয়ে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এরপর ভেতরে দুটি মরেদহ পাওয়া যায়। আর আহত তিনজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা আলামত সংগ্রহের কাজ করছেন।
তিনি আরও বলেন, বাড়িতে ছোট ছোট সব ঘর। দেখে মনে হচ্ছে, বাড়ির মালিকের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। বাড়ির মালিককে এখনো পাওয়া যায়নি। এসব বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে।
এ ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, আবাসিক এলাকায় এত বিপজ্জনক কার্যক্রম কীভাবে চলছিল, যদিও স্থানীয়দের দাবি ওই বাড়িতে একদল ব্যক্তি ককটেল তৈরির সরঞ্জামসহ অবস্থান করছিল কিন্তু এলাকাবাসী বা প্রশাসন আগে কিছু জানত না। কারা এতে জড়িত ছিল তা জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আর তৈরি করা এসব ককটেল কোথায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ছিল। সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, এমন একটি বিপজ্জনক কাজ তাদের আবাসিক এলাকায় চলছিল, তা তারা জানতেন না। যে কোনো সময় আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। এলাকাবাসী দাবি করছেন, এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হোক এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় বিস্তৃত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। ককটেল তৈরি, মজুদ ও ব্যবহার আইনে নিষিদ্ধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় পুলিশি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।