সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মহান শিক্ষক দিবস পালিত

রাবি প্রতিবেদক ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
রাবি প্রতিবেদক ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:১৩ অপরাহ্ন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মহান শিক্ষক দিবস পালিত
মহান শিক্ষক দিবসে উপাচার্যসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ শহীদ ড. জোহার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন

বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মহান শিক্ষক দিবস পালিত হয়। উনসত্তরের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তানি সেনাদের বেয়োনেট চার্জে নিহত হন। তিনিই এদেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। দিবসের কর্মসূচিতে বুধবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনসমূহে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।


সকাল ৯টায় উপাচার্য প্রফেসর সালেহ্ হাসান নকীব, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মোহা: ফরিদ উদ্দীন খান, কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মতিয়ার রহমানসহ প্রশাসনের ঊর্ধতন কর্মকর্তাগণ শহীদ ড. জোহার সমাধি ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও মোনাজাত করেন। এরপর রসায়ন বিভাগ ও শহীদ শামসুজ্জোহা হলসহ অন্যান্য আবাসিক হল, বিভাগ, রাবি স্কুলসমূহ, শিক্ষক সমিতি, অফিসার সমিতি এবং হল, বিভাগসহ অন্যান্য পেশাজীবী সমিতি ও ইউনিয়ন শহীদ জোহার সমাধি ও স্মৃতিফলকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। 


সকাল ১০টায় সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হয় জোহা স্মারক বক্তৃতা। এতে ‘ইতিহাস চর্চার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।  


এই আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক উপাচার্য প্রফেসর সালেহ্ হাসান নকীব এবং পৃষ্ঠপোষক উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মোহা: ফরিদ উদ্দীন খান, কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মতিয়ার রহমান। রসায়ন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া এতে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে অন্যদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রফেসর ইফতিখারুল আলম মাসউদ, প্রক্টর প্রফেসর মো. মাহবুবর রহমান, ছাত্র-উপদেষ্টা প্রফেসর মো. আমিরুল ইসলাম, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক প্রফেসর মো. আখতার হোসেন মজুমদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।  


স্মারক বক্তা মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ইতিহাস হলো সময়ের আখ্যান। সময়কে আমরা নানাভাবে দেখি। দেখার চোখ সকলের একরকম নয়। ফলে একই সময়ের নানান বিবরণ পাওয়া যায়। সেসব বিবরণে যেমন ভিন্নতা থাকে, তেমনি থাকে সাংঘর্ষিক বক্তব্য। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করব, কোনটি এড়িয়ে যাব, কোনটি বর্জন করব।


উপনিবেশের মানুষ হওয়ায় আমাদের মধ্যে একধরনের উপনিবেশবাদবিরোধী চিন্তার জন্ম হয়েছে। এর ফলে আমরা অনেকেই যা কিছু দেশজ, তাকে ভালো বলি আর যা ইউরোপ থেকে এসেছে তাকে খারাপ বলি। ইতিহাসের চরিত্রগুলো নিয়েও একই কথা আমাদের লোকেরা বীর, নায়ক। বহিরাগতরা ষড়যন্ত্রকারী, খলনায়ক। একটি উপনিবেশ-উত্তর সমাজে ইতিহাসচর্চার এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


‘বিজয়ীরা ইতিহাস লেখে’ এটি একটি বহুল প্রচলিত উক্তি। এর অর্থ হলো, যে জেতে, সে তার জয়কে ন্যায্যতা দিতে একরকম ভাবে লেখে। সে ইতিহাস পরাজিতের পছন্দ হয় না। কেননা, পরাজিত মনে করে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। এখানে উভয় পক্ষের মধ্যে নিজেকে মহিমান্বিত করে তোলার চেষ্টা থাকে।


কেউ তো চিরকাল বিজয়ী থাকে না। একবার না একবার তার পতন হয় বা সে হেরে যায়। এরকম সম্ভাবনা থাকলে ইতিহাস বারবার পাল্টায়। নতুন নতুন বয়ান তৈরি হয়। সব বয়ানের পেছনেই কিছু না কিছু জনসমর্থন থাকে, থাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই একসময় নির্মোহ ইতিহাস রচনার বাতাবরণ তৈরি হয়।


ইতিহাসের নানান পর্বে আমরা বিচিত্র ধরনের চরিত্রের দেখা পাই। তারা এই সমাজেরই অংশ। তারা অবলীলায় মিথ্যা কথা বলে, বাগাড়ম্বর করে, প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গে। বাঙালি চরিত্রের সঙ্গে এসব যেন মিশে আছে।


আমাদের মতো দেশে ইতিহাস চর্চায় সরকারের ভূমিকা বেশ প্রবল। সরকারি বক্তব্য, বিবৃতি ও ক্রোড়পত্রে আমরা একমাত্রিক বিবরণ পাই। সরকারি আনুকূল্যের আশায় বিদ্বৎসমাজের একটি অংশ সরকারি বয়ানে গা ভাসিয়ে দেয়। তাঁরা তো সমাজের ‘ওপিনিয়ন মেকার’, জনমতকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন। ফলে সেটি অনেক সময় ন্যায্যতা পেয়ে যায়। তবে দেশে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা থাকে, স্বাধীন গণমাধ্যম থাকে, তাহলে বহুমাত্রিক বিবরণ পাওয়ার সুযোগ থাকে। ইতিহাস চর্চা তখন আর একতরফা হয় না।


ইতিহাস চর্চার বিষয়টি সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকলে ভালো হয়। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এ ধরনের উদ্যোগে সামিল হলে কাজটি সহজ হয়। সমস্যা হলো, নামে স্বায়ত্তশাসিত হলেও বাস্তবে স্বায়ত্বশাসন নেই। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বা সরকারের কর্তাব্যাক্তিদের মুখের দিকে তাকিয়ে গবেষণার বিষয়, পরিধি ও গবেষকের তালিকা নির্ধারণ করতে হয়।


প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কাজ হচ্ছে। সেখানেও আছে নানান চ্যালেঞ্জ। লেখক যদি বিশেষ কোনো মতাদর্শের অনুসারী হন, তিনি সেই মতাদর্শের লেন্স দিয়েই সবকিছু দেখেন। স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে চাইলেও অবচেতনে এক ধরনের পক্ষপাত কাজ করে।


তারপরও ইতিহাস চর্চা হয়। ইতিহাস আসলে একপ্রকারের সামাজিক নির্মিতি বা ‘সোশ্যাল কনস্ট্রাকশন’। আমরা যেভাবে দেখতে চাই, সেভাবেই তৈরি করি। তাতে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না, ছোঁয়া যায় না। তারপরও আমরা অতীতকে খোঁজার ও তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যত দিন যাবে, আমরা ততই নতুন নতুন তথ্য পাব, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্বচ্ছ হবে, মনের জানালাগুলো খুলে যাবে, সংকীর্ণ শ্রেণি ও জাতিবাদী চিন্তা দূর হবে, ইতিহাস আরও সম্পূর্ণতার দিকে যাবে। তারপরও বিতর্ক থাকবে। মতভিন্নতা ও বিতর্ক তো সুস্থ সমাজের লক্ষণ। 


অনুষ্ঠানে উপাচার্য বলেন, ড. জোহার স্মরণে জোহা স্মারক বক্তৃতা শিক্ষক দিবস পালনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ড. জোহার মধ্যে ছিল যোগ্যতা, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সর্বোপরি অমিত সম্ভাবনা; তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। তাঁর এই গুণগুলো বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। অনেক মহান মানুষ আমাদের সমাজে আছেন, কিন্তু আমরা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের কুক্ষিগত করার চেষ্টা করি।


এতে করে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় না, আবার যেভাবে তাঁদের ধারণ করতে চাই তাও পারি না। আজকের ‘২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা যেন সেই সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারি। আমরা যেন শহীদ জোহার আদর্শকে ধারণ করতে পারি, দেশের কল্যাণে যেন তাঁর মতো নিবেদিত হতে পারি, এই হোক আমাদের প্রত্যয়।  


প্রসঙ্গত, দিবসের কর্মসূচিতে আরও ছিল বাদ জোহর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরআনখানি ও বিশেষ মোনাজাত, বাদ আছর শহীদ শামসুজ্জোহা হলে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল। এ দিন শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা ছিল।