লোকসান কাটিয়ে চাঙ্গা রাজশাহীর পানবাজার
গেল কার্তিকের বৃষ্টিতে রাজশাহী অঞ্চলের পানচাষিরা মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখিন হন। পানে পচন দেখা দেয়। তার আগে বর্ষাজুড়ে পানের বাজার দরে পুঁজি-বিনাশী পতনের সম্মুখিন হতে হয়। কার্তিকের বর্ষণ ছিল ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’-এর মত। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে পানের দর উর্ধমুখি হতে থাকে। কৃষকের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়। তাদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক।
রাজশাহীর সবচেয়ে বড় পানের হাট বসে বাগমারার মচমইলে। সপ্তায় শুক্রবার ও সেমবারে এখানের হাট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যাপারিরা এই হাট থেকে পান কিনে নিয়ে সারা দেশে সরবরাহ করেন। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) মচইলহাটে সর্বোৎকুষ্ট এক পোয়া পান (৩২ বিড়া- এক বিড়ায় ৬৪টি পান) বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৮০০ টাকা দরে। মাঝারি আকৃতির পানের দর ছিল ৩ হাজার টাকা। ছোট আকৃতির পানের সর্বনিম্ন দর ৫০০ টাকা পোয়া দরে বিক্রি হয়েছে।
অথচ গেল বর্ষায় হাটের সবচেয়ে ভাল পান বিক্রি হয়েছে পোয়া ৩০০ টাকা দরে। বর্তমানে চাষিরা পানের উর্ধদরে সন্তুষ্ট। ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর থেকে পানের দর ক্রমেই উর্ধমুখি হচ্ছে। রমজান মাসে পানের চাহিদা কিছুটা কমে যায়- তখন দামের সামান্য পতন হয়। কিন্তু এবারের রোজা শুরু হলেও বাজারে দরের সামান্য হেরফের লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বরং চাষিরা আশা করছেন রোজার পর পানের দাম আরো বৃদ্ধি পাবে।
হাটে সাধারণণত ঝাড়া পান, মাঝারি পান, সাত্তা পান ( ছোট ও চিকন) এবং পাকা ও দাগ ধরা- এই চার ধরনের পান কেনাবেচা হয়। প্রকার ভেদে দামের তারতম্য হয়। ঝাড়া পান সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয়। এরপরেই মাঝারি পানের দাম।
উল্লেখ্য, রাজশাহীর পান ঐতিহ্যবাহী, সুস্বাদু ও মিষ্টি হিসেবে সারা দেশে পানসেবিদের কাছে জনপ্রিয়। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে রাজশাহীর পান স্বীকৃতি প্রাপ্ত। পান ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য ও সামাজিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। এটি কেবল একটি পাতা নয়, বরং আতিথেয়তা, পরস্পর ভালোবাসা ও সংস্কৃতির প্রতীক, যা প্রাচীনকাল থেকেই আভিজাত্য ও সামাজিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে পান-সুপারির মাধ্যমে সম্মানিত অতিথিকে আপ্যায়ন করা হয়।
মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার হরিদাগাছি এলাকার পানচাষি বাবু জানান, তাঁর দশ কাঠা জমিতে পানের বরজ রয়েছে। বাজারে পানের আকার ও মান অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। তিনি বলেন, “আজ স্থানীয় হাটে মাঝারি সাইজের পান ১০০ টাকা এবং বড় সাইজের পান ১৫০ টাকা বিড়া দরে বিক্রি করেছি।”
একই উপজেলার বাকশিমইল গ্রামের চাষি আশরাফ আলী বলেন, এক বিঘা জমিতে তাঁর পানের বরজ রয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও যে পান ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এক পোয়া পানের দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান স্থানীয় আরেক পানচাষি বদের উদ্দিন ভুলা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে জেলার ৯টি উপজেলায় ৪ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৯ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে ৪ হাজার ৫০০ হেক্টরে আবাদ হয়ে উৎপাদন হয়েছিল ৭৭ হাজার ২২০ মেট্রিক টন।
পান রাজশাহী অঞ্চলের একটি অর্থকরি ফসল যা আমের ওপরে স্থান করে নিয়েছে। রাজশাহীর পান বিদেশেও রপ্তানি হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ‘রাজশাহীর মিষ্টি পান’ জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির পর বাজারে রাজশাহীর পানের ব্র্যান্ডমূল্য আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহীতে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পান কেনাবেচা হয়।
বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে এবং পরিবহন ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়লে পানচাষে আরও বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করা হচ্ছে।