সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

ইরানের ‘বন্ধুরা’ কোথায়? চিন-রাশিয়া ‘দূরত্ব’ বজায় রাখছে কেন

সোনার দেশ ডেস্ক ০৬ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৬ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৬ অপরাহ্ন
ইরানের ‘বন্ধুরা’ কোথায়? চিন-রাশিয়া ‘দূরত্ব’ বজায় রাখছে কেন
সংগৃহীত ছবি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিলেও এখনো সামরিক সহায়তার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি তেহরানের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাশিয়া ও চিন।


রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকে ‘সব মানবিক নীতিমালার নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন।


চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই তাঁর ইসরায়েলি কাউন্টারপার্ট গিডিয়ান সার-কে বলেছেন, ‘শক্তি প্রয়োগ কখনোই প্রকৃত অর্থে সমস্যার সমাধান করতে পারে না।’ একইসঙ্গে তিনি সব পক্ষকে উত্তেজনা আরও না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।


রাশিয়া ও চিন যৌথভাবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল-এ জরুরি বৈঠক আহ্বানের অনুরোধ জানিয়েছেন।


এসব প্রতিক্রিয়া ইরান, রাশিয়া ও চিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিফলন। মস্কো ও বেইজিং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং যৌথ নৌ-মহড়ার মাধ্যমে সমন্বয় বাড়িয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রদর্শন করছে, যা দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে।


অন্যদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিলেও, ইরানের পাশে দাঁড়াতে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ বা সহায়তার কোনো ইচ্ছা রাশিয়া-চীন প্রকাশ করেনি।


রাশিয়া-ইরান: কৌশলগত অংশীদার, সামরিক মিত্র নয়


২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে।


চুক্তিটি ট্রান্সপোর্ট করিডোর, ইরানের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে রাশিয়াকে যুক্ত করাসহ সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প এবং প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সমন্বয় গভীর করেছে।


ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ঠিক আগ মুহূর্তে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ভারত মহাসাগরে যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করে রাশিয়া ও ইরান।


যাইহোক, যুদ্ধ শুরুর পর প্রতিক্রিয়া জানানো মস্কোর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না; কারণ চুক্তিটিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা নেই। অর্থাৎ এটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট গঠনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।


রুশ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক থিংকট্যাঙ্ক, রাশিয়ার আন্তর্জাতিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল-এর সাবেক মহাপরিচালক এবং ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব-এর সদস্য অ্যান্দ্রেই কোরতুনোভ বলেন, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে আরও বাধ্যতামূলক একটি চুক্তির উদাহরণ।


তিনি বলেন, ওই চুক্তি অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া কোনো সংঘাতে জড়ালে রাশিয়াকে সেখানে যোগ দিতে বাধ্য থাকতে হবে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে কেবল উল্লেখ করা হয়েছে—যদি কোনো পক্ষ সংঘাতে জড়ায়, অন্য পক্ষ শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে।


অ্যান্দ্রেই কোরতুনোভ বলেন, ইরানকে সমর্থন দিয়ে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।


তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে মস্কো সম্ভবত অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাশাপাশি উল্লেখ করেন, জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পরও ভেনেজুয়েলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ সমালোচনা করলেও রাশিয়া একই ধরনের সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল।


অ্যান্দ্রেই কোরতুনোভ আরও বলেন, যদিও চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য নয়, তবুও তেহরানে তার কিছু পরিচিতজনের মধ্যে ‘এক ধরনের হতাশা’ দেখা গেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার বাইরে রাশিয়া আরও কিছু করবে।


চিন-ইরান সম্পর্ক এবং সীমাবদ্ধতা


জ্বালানি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে ২০২১ সালে চীন ও ইরান একটি ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ অন্তর্ভুক্ত করা।


চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি-এর গবেষক জোডি ওয়েন, যিনি প্রায়ই ইরান সফর করেন, বলেন, বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এই সম্পর্ককে বাস্তবসম্মত ও স্থিতিশীল হিসেবে দেখা হয়।


তিনি বলেন, রাজনৈতিক দিক থেকে নিয়মিত বিনিময় থাকে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও দুই দেশের সহযোগিতা গভীর; অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান ইরানে বিনিয়োগ করেছে।


জোডি ওয়েন জোর দিয়ে বলেন, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে, বিশেষ করে সামরিক জড়িত হওয়ার ব্যাপারে।


তিনি বলেন, চীনা সরকার সবসময় অন্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে। তিনি মনে করেন না চীনা সরকার ইরানে অস্ত্র পাঠাবে।


জোডি ওয়েন বলেন, সামরিক সহায়তার পরিবর্তে বেইজিং কূটনীতি ও ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে ভূমিকা রাখবে। তিনি মনে করেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।


তিনি বলেন, এই সম্পর্ক সমানভাবে পারস্পরিক নয়। জাহাজ ট্র্যাকিং সেবা কেপলার অনুসারে, ইরানের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ চীনে যায়। এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য, কিন্তু ইরান চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে তুলনামূলকভাবে ছোট অংশীদার।


সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রোগ্রামের সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লো বলেন, ইরান নিয়ে চীনের ভূমিকা ‘রক্ষামূলক’এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করতে মধ্যস্থতার চেষ্টা দ্রুততর করছে।


তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বাংলানিউজ