সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

ধর্ষণ-সহিংসতায় উদ্বেগ, নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

সোনার দেশ ডেস্ক ০৮ মার্চ ২০২৬ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ০৮ মার্চ ২০২৬ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন
ধর্ষণ-সহিংসতায় উদ্বেগ, নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতীকী ছবি

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সংসদের বিরোধী দলের নেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, নতুন সরকার গঠনের পর ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, গত ১৮ বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রভাবেই এসব ঘটনা ঘটছে। নতুন সরকারকে সেই অপসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা সামাল দিতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি বদলাতে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আগের মাস জানুয়ারিতে সহিংসতার শিকার হন ২৭২ জন নারী ও কন্যাশিশু, যাদের মধ্যে ৭০ জন ধর্ষণের শিকার।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত বিশেষ সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি টিম লিডার মরিয়ম নেসা।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ২৮১টি। আগের মাস গত বছরের ডিসেম্বরে মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৪৮টি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন কন্যাশিশু, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১৮৩ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৩ জন কন্যা এবং ১১০ জন নারী। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩২ জন, যাদের মধ্যে ৪ জন কন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪ জন কন্যাসহ মোট ৭ জন। এর মধ্যে ২ জন কন্যাসহ ৪ জন যৌন নিপীড়ন, ২ জন উত্ত্যক্তকরণ এবং ১ জন নারী সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসে ৩ জন কন্যা ও ১৪ জন নারীসহ মোট ১৭ জনের মৃত্যু রহস্যজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আত্মহত্যা করেছেন ৮ জন নারী। এসিডদগ্ধ ও অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন একজন করে। যৌতুকজনিত সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫ জন নারী, যার মধ্যে ৩ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩ জন এবং গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ৩ জন।

এছাড়া অপহরণের শিকার হয়েছেন ১ জন কন্যাসহ ২ জন এবং ২ জন কন্যাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। মানবপাচারের শিকার হয়েছেন ২০ জন কন্যাসহ মোট ৪০ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ জন কন্যাসহ ১৫ জন। এছাড়া ২ জনের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের চেষ্টা এবং ১ জন কন্যাসহ আরও ৭ জন বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে কমপক্ষে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার অন্তত ৪৫ জন, যাদের ২৪ জনের বয়স ১৮ বছরের কম। ১০ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে। যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন ৯০ জন নারী ও কন্যাশিশু, যার মধ্যে ১১ জন শিশু।

সংগঠনটি আরও জানায়, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় একজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪১ জন, আহত হয়েছেন ২৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩০ জন নারী। এছাড়া এসিড সহিংসতায় নিহত হয়েছেন এক নারী।

অন্যদিকে ৯৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৪ জন নিহত এবং ৫১ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে আমেনা আক্তার (১৫) নামে এক কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। স্থানীয় কয়েকজন তার বাবার কাছ থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মহিষাশুরা ইউনিয়নের দাউদকান্দি এলাকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে বাড়িতে ঢুকে দাদি সুফিয়া বেগমকে হত্যা করে তার নাতনি জমিলা আক্তারকে (১৫) গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ধারণা। অপহরণে বাধা দেওয়ায় প্রথমে দাদিকে এবং পরে ধর্ষণের পর নাতনিকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছে পুলিশ।

এদিকে, গত শুক্রবার (৬ মার্চ) রাজধানীর উত্তরার ফ্রেন্ডস ক্লাব মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা সাংগঠনিক বিভাগীয় ইফতার ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলটির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর সারা দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার জেরে নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সারা দেশে নারী নির্যাতন ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি হাতিয়ার চাননন্দী ইউনিয়নে শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার জেরে স্বামীকে বেঁধে রেখে তিন সন্তানের জননীকে (৩২) ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা আগের ১৮ বছরের ধারাবাহিকতার ফল। আইন না মানা, আইনের শাসনের অভাব এবং বিচার না হওয়ার সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রভাব এসব ঘটনার পেছনে কাজ করছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এখনো এক মাসও পূর্ণ করেনি। তাই তুলনামূলক বিশ্লেষণের বদলে সমাধানের পথে এগোতে হবে। দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মানবাধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধ দমনে নিরপেক্ষতা ও বিচার নিশ্চিত না হলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। তাই এ বিষয়ে সরকারকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তা না হলে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় জড়িত অধিকাংশকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে পুলিশ সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনও ঘটনা ঘটলে পুলিশকে জানালে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র : বাংলাট্রিবিউন