স্বাধীনতা দিবসে গীতা পাঠ করতে নিষেধ করলেন জামায়াত এমপি
রাজশাহী -১ (তানোর- গোদাগাড়ী) আসনে জামায়াতের এমপি ও কেন্দ্রীয় জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে গীতা পাঠ করা যাবে না মর্মে নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কে নির্দেশ দিয়েছেন। ইউএনও নাঈমা খান বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে এমপির এমন নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে গীতা পাঠ করানো হয়। তার আগে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এখবর ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনসহ রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উঠে নানামুখী সমালোচনা।
জানা গেছে, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালনের অনুষ্ঠানে শুধু মাত্র কোরআন তেলাওয়াত করাতে হবে। কোনভাবেই গীতা পাঠ করানো যাবে না। কেন্দ্রীয় জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমন নির্দেশনা দেন। তার এমন নির্দেশনার খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন সহ রাজনৈতিক নেতা, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাসহ জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। বইছে নানা ধরনের সমালোচনা। এমপির এমন একগুঁয়েমি কথায় উপজেলা প্রশাসন চরম বিব্রত।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁন কে মোবাইল ফোনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে গীতা পাঠ করানো যাবে না বলে নির্দেশনা দেন। ২৫ মার্চ বুধবার সকালের দিকে গণহত্যা দিবস পালন উপলক্ষে উপজেলা সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আলমগীর হোসেনসহ বিএনপির নেতারা। সেখানে জামায়াত আমীর কে ইউএনও বলেন, এমপি স্যার গীতা পাঠ করতে নিষেধ করেছে। এমন কথার প্রেক্ষিতে আমীর ইউএনও কে বলেন রাষ্ট্রীয় নিয়মে যেটা আছে সেটাই করবেন।
সূত্র আরো জানায়, রাষ্ট্রীয় সভায় কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে। কিন্তু গত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে রাজশাহী -১ আসনে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বিজয় লাভ করেন। বিএনপি সরকার গঠন করেন। প্রথম বারের মত জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হয়। বিরোধী দল হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করেন বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুল ইসলাম সহ সংসদ সদস্যরা। জামায়াত এবার জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেন। আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক দেয়া হয়। তবে তিনি বিজয় লাভ করতে পারেননি। তাহলে ভোটের মাঠে ক্ষমতার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের জামায়াতের নির্বাচনী মঞ্চে বক্তব্য দেয়া হবে। আর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ হবে না এটা কোন ধরনের জামায়াতের নিয়ম। আসলে তিনি এমপি হয়ে অতীতকে ভুলে গেছেন। তাঁকে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভোট দিয়েছিল। তাহলে তিনি কেন রাজনৈতিক উগ্রবাদী আচরণ করছেন। এটা একজন কেন্দ্রীয় জামায়াতের নায়েবে আমীরের মুখে শোভা পায় না।
বিএনপির একাধিক নেতারা জানান, আমরা যখন এমন কথা শুনলাম- তখন আমরাও রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান চলবে মর্মে ইউএনওকে অবহিত করি। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে জামায়াত রাজনীতি করবে আর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ হবে না এটা কোন ধরনের কথা হতে পারে । সারা দেশে কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান চলছে। আর তানোরে গীতা পাঠ হবে না, তানোর কি বাংলাদেশের বাইরে- নাকি এমপি সাহেব তানোরকে আলাদা ভূখণ্ড করতে চায়? অতীতে তারা কখনো শহীদ মিনারে আসত না, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করত না। এখন তারা সব কিছু করছে। তাহলে কেন গীতা পাঠ হবে না। অবশ্যই গীতা পাঠ হবে। কারণ বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ। হিন্দু-মুসলিম সবাই সৌহার্দ্য সম্প্রীতি নিয়ে ্ দেশে চলাফেরা ও বসবাস করা হয়। সুতরাং এ সৌহার্দ্য সম্প্রীতি কাউকে নষ্ট করতে দেয়া হবে না। এমপির এধরনের কথাকে আমরা দৃঢ়ভাবে ধিক্কার ও প্রত্যাখান করছি।
গত বুধবার দুপুরের দিকে উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আলমগীর হোসেনের মোবাইলে যোগাযোগ করে বিষয় টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ইউএনও স্যারকে এভাবে বলেনি এমপি সাহেব, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ করা যাবে না বলে বলেছিল। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ করতে নিষেধ করেছিলেন এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জানতে চাইলে তিনি জানান, আপনাকে কে বললো, কার কাছ থেকে শুনেছেন এমন কথা- বলা শুরু করেন তিনি। পুনরায় তার কাছে জানতে চাওয়া হয় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ করতে নিষেধ করা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, ইউএনও স্যার বিষয়টা আমাকে বলার পর আমি বলেছি যেভাবে নিয়ম আছে সেভাবে অনুষ্ঠান করবেন। তবে এবিষয়ে তিনি এমপি সাহেবের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
বুধবার দুপুরের দিকে ও বৃহস্পতিবার দুপুরর দিকে এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানে মোবাইল ফোন ও হোয়াটস অ্যাপে একাধিক বার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। যার কারণে এ সংক্রান্ত তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি।
বৃহস্পতিবার দুপুরর দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁনের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এমপি স্যার মোবাইল ফোন করে গীতা পাঠ করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়মে পালন করতে হবে। এ কারণে কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান করা হয়েছে।