পবায় হারভেস্টারে দ্রুত গম কাটছেন কৃষক, তেলসংকটে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
গম কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় রাজশাহীর পবা উপজেলায় কৃষকেরা হারভেস্টার মেশিনে দ্রুত গম ঘরে তুলছেন। মেঘলা আবহাওয়ায় সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফসল কাটায় ঝুঁকেছেন তাঁরা। এতে সময় ও খরচ-দুই-ই কমছে। তবে জ্বালানি তেলের সংকটে হারভেস্টার চালানো নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এতে মাঠের পাকা গম ঘরে তোলা এবং ধানের জমিতে সেচ কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে পবা উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ও ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ না পাওয়ায় পাম্পমালিকেরা চাপে আছেন। তবে কৃষিকাজের জন্য কৃষি বিভাগের প্রত্যয়নপত্র দেখিয়ে অনেক কৃষক ও হারভেস্টার মালিক তেল সংগ্রহ করছেন। এতে অধিকাংশ মাঠে দ্রুতগতিতে গম কাটার কাজ চলছে।
কৃষকেরা জানান, হারভেস্টার মেশিনে এক বিঘা জমির গম কাটতে সময় লাগছে প্রায় এক ঘণ্টা, খরচ হচ্ছে দুই হাজার টাকা। একই জমির গম সনাতন পদ্ধতিতে কাটতে সময় লাগে প্রায় এক দিন, আর খরচ পড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক এখন পুরোপুরি হারভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
পবা উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ১৫ হেক্টর জমি। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ১৭ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৭৬ মেট্রিক টন। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৪৫ টন। ইতোমধ্যে উপজেলার ৯৪ শতাংশ গম কর্তন শেষ হয়েছে।
পবা উপজেলার বায়া ভোলাবাড়ি মাঠের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, তাঁর গম আগেই কাটার উপযোগী হয়েছিল। কিন্তু মেশিন না পাওয়ায় সময়মতো কাটতে পারেননি। পরে কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে হারভেস্টার নামাতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “আজ হাবিব ফিলিং স্টেশন থেকে ১০০ লিটার তেল পেয়েছি। সঠিক সময়ে গম না কাটতে পারলে ফলন অর্ধেকে নেমে আসবে। গম কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় না। এখানে সবাই হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভরশীল।”
ভূগরইল মাঠের কৃষক জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক ঘুরে হারভেস্টার মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি সিরিয়াল পেয়েছেন। এবার দুই বিঘা জমিতে গম চাষ করেছিলেন। ফলনও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, “আকাশে মেঘ দেখে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনো সমস্যা ছাড়াই গম কাটা শেষ করেছি। হারভেস্টার মেশিন ছাড়া সঠিক সময়ে কম খরচে গম কাটা সম্ভব হতো না।” তাঁর ভাষ্য, গত বছর শ্রমিক দিয়ে গম কাটতে বিঘাপ্রতি সাড়ে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল।
একই এলাকার কৃষক সাহেদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করলেও এমন পরিস্থিতিতে আগে পড়েননি। মাঠে পাকা ফসল পড়ে থাকায় তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রাতে ঘুমও ঠিকমতো হতো না। অবশেষে গম কাটতে পেরে তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। হারভেস্টার মেশিন মালিক মতিন বলেন, নাটোর সিংড়া থেকে এখানে গম কর্তন করতে এসেছি। এক বিঘা জমির গম কাটতে ৭ থেকে ৮ লিটার তেল লাগে। তেল না থাকলে মেশিন চালানো সম্ভব নয়। এ কারণে কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে।
মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রাকিব বলেন, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ ডিজেল বরাদ্দ আসছে, তা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে কৃষকদের মধ্যে দেওয়া হচ্ছে।
পবা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও হাবিব ফিলিং স্টেশনের ট্যাগ কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন আল মামুন বলেন, কৃষিকাজের সুবিধার জন্য কৃষি কার্ড ও প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের ডিজেল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন, তেলসংকটে কৃষকেরা সমস্যায় পড়েছেন। মাঠজুড়ে পাকা গম নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় যতটুকু তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা যেন কৃষকেরা পান, সে চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পবা উপজেলার ৯৪ শতাংশ গম কর্তন সম্পন্ন হয়েছে।
তবে শুধু গম কাটাই নয়, জ্বালানি সংকটের প্রভাব ধানের জমিতে সেচকাজেও পড়ছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় অনেক স্থানে পানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে তা ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।