সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

জ্বালানি সংকটে কাঁচাবাজারে চাপ, রাজশাহীতে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৮ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৮ অপরাহ্ন
জ্বালানি সংকটে কাঁচাবাজারে চাপ, রাজশাহীতে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের ফলে এবার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের বাজারে। পণ্যবাহী যানবাহনে জ্বালানি সংকট, পরিবহনে ব্যাঘাত এবং ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। 


সরেজমিনে সোমবার (৬ এপ্রিল) নগরীর সাহেববাজার, আরডিএ মার্কেট ও পবা উপজেলার নওহাটা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে আলু, পটল, বেগুন ও টমেটোর মতো সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে দুই দিনের ব্যবধানে চাল, আটা, চিনি, খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক কম বাড়লেও সোনালি ও দেশি মুরগির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।


ক্রেতাদের অভিযোগ, জ্বালানি সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাজার-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া গত এক মাসে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আবার অনেক পণ্যবাহী যান ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।


রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পণ্য আনতে খরচ বেড়েছে। আবার পণ্য সময়মতো আড়তে পৌঁছাতে পারছে না। অনেক সময় ট্রাক দেরি করে পৌঁছানোর কারণে সবজি পথেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি আড়তদারদেরও লোকসান গুনতে হচ্ছে।


বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। দেশি উচ্ছে করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৮০ টাকা। শিমের কেজি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০ টাকা। ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা থেকে উঠে হয়েছে ১০০ টাকা। টমেটো ৩০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। গাজর ৬০ টাকা, বেগুন ৯০ থেকে ১০০ টাকা, সজনে ডাঁটা ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।


মাংস ও মুরগির বাজারেও দাম ঊর্ধ্বমুখী। গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকায় উঠেছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৮০০ টাকা কেজিতে।


খাদ্যপণ্য ও ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, চাল কেজিতে ২ থেকে আড়াই টাকা, আটা ২ টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ৫০ কেজির চিনির বস্তায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরা পর্যায়ে দুই দিন আগেও খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ছিল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা, যা এখন ১৯০ থেকে ১৯২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে পাম অয়েল ১৭৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা।


নগরীর সাহেববাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম বলেন, বেতন বাড়ছে না, কিন্তু চাল, ডাল, চিনি, তেল ও সবজির দাম ক্রমেই বাড়ছে। জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে পণ্য পরিবহনে সমস্যার কথা বলে বাজারে নতুন করে এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষায়, সবকিছু এখন সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।


আড়তদারদের দাবি, জ্বালানি তেলের সরকারি দাম না বাড়লেও সরবরাহ-সংকটের কারণে বাজারে এক ধরনের অঘোষিত কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে পাইকারি ও খুচরা-উভয় পর্যায়েই সবজির দাম বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনে নিত্যপণ্যের বাজারে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।


মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ বলছেন, বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও তাদের আয় বাড়েনি। নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালানো মানুষের জন্য বাজারের ফর্দ ছোট করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজারে এলেই এখন হিসাবের খাতা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো স্বাভাবিক নেই কিছুই।


জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বাজারে তৈরি হওয়া এই চাপ শুধু ক্রেতার ব্যয়ই বাড়াচ্ছে না, কৃষক, পরিবহনশ্রমিক ও ব্যবসায়ীদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বাজারে কঠোর তদারকি বাড়ানো না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।