খালেদা ও হাসিনা সরকারের শেষ বছরের অর্থনীতির তুলনা সংসদে দিলেন অর্থমন্ত্রী
দুই দশক আগে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ বছরে দেশের অর্থনীতি কেমন ছিল তার সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের শেষ বছরের অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, দেড় যুগের ব্যবধানে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠেছে।
অর্থমন্ত্রী কিছু ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েরও চিত্র তুলে ধরেছেন। শুক্রবার সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে এ বিষয়ে বিবৃতি দেন তিনি।
এ বিধি অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি দিতে পারেন। এসময় কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার সুযোগ নেই।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি একটি ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে’ জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগণের কাছে ‘দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায়’ বিশ্বাস করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির’ সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।
‘প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে’
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রয়াত খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের শেষ অর্থবছরে (২০০৫-০৬) স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সে সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ।
তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে, আর মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে।
শিল্প ও কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির মন্থরতার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে নেমে আসে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে।
কর্মসংস্থানে কাঠামোগত সংকট
দেশের কর্মসংস্থানের চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কাজ তৈরি না হওয়ায় তরুণদের বড় অংশকে কৃষিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এতে ছদ্ম-বেকারত্ব বেড়েছে এবং উৎপাদনশীলতা কমেছে।
তিনি বলেন, গত এক দশকে কৃষিখাতে মূল্য সংযোজন প্রায় ৪ শতাংশ কমলেও এ খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতে অবদান বাড়লেও কর্মসংস্থান কমেছে।
বর্তমানে কৃষিখাত মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ দিলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এ খাতে নির্ভরশীল বলে ভাষ্য অর্থমন্ত্রীর। এ অবস্থা ‘কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি’র ঝুঁকির পরিচায়ক বলে মনে করেন তিনি।
সঞ্চয় কমেছে, বেড়েছে বহিঃখাতের চাপ
বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ভারসাম্য নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ সালে বিনিয়োগ বেড়ে জিডিপির ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় কমে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, এই ঘাটতি মেটাতে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, ফলে বহিঃখাতে চাপ বেড়েছে।
টাকার মান কমেছে, আমদানি ব্যয় বেড়েছে
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭ দশমিক ২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা হয় ১১১ টাকা, আর ২০২৪-২৫ সালে দাঁড়ায় ১২১ টাকায়।
তিনি বলেন, “ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।”
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
মুদ্রা সরবরাহ ও ঋণপ্রবাহে ধীরগতি
মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রেও ধীরগতির চিত্র তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বা এম২ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এম২ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশে, আর রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, ২০০৬ সালের জুনে অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে।
অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নামার তথ্য দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপে ইঙ্গিত দেয়।
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০০৫-০৬ সালের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২৩-২৪ সালে ৯ দশমিক ৮ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ সালে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি।
রাজস্বে অগ্রগতি নেই, ঘাটতি বেড়েছে
রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি মনে করেন তারেক রহমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সেই সময় ব্যয় ছিল জিডিপির ১১ দশমিক ১ শতাংশ, ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪ হাজার ৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশেই স্থির থাকে। একই সময়ে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২ শতাংশে, ফলে ঘাটতি হয় ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ।
আমির খসরু বলেন, কেবল ঘাটতি বাড়েনি, ব্যয়ের মানও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। মেগা প্রকল্পে অতিমূল্যায়নের পাশাপাশি সম্ভাব্যতা যাচাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে হয়নি। ফলে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেনি।
“লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে বিষদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।”
সুদ ব্যয়ের চিত্র ‘উদ্বেগজনক’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি ঋণের গঠনে ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে মোট সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। সেই সময় সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা।
২০২৩-২৪ সালে মোট ঋণের অনুপাত প্রায় একই থাকলেও অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশে, আর বৈদেশিক ঋণ নামে ১৭ দশমিক ১ শতাংশে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক ঋণের একটি অংশ নন-কনসেশনাল বা অনেকক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক হওয়ায় ঋণের স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্রকে ‘উদ্বেগজনক’ বর্ণনা করে তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সালের ৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৩-২৪ সালে সুদ পরিশোধ বেড়ে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার মানে ১৩ গুণের বেশি বেড়েছে।
অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে এসএমইসহ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন আমির খসরু।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ